ভালোবাসা চার অক্ষরের একটা শব্দ।আমি বুঝতে চেষ্টা করি এর মর্ম কথা,এর মহত্ত্ববোধ,এর প্রকৃত মানে।যদিও বর্তমানে আমাদের সমাজে ভালোবাসা শব্দটা শুধুমাত্র ব্যবহৃত হয় প্রেমিক প্রেমিকার ক্ষেত্রে।কারো কাছে এটা অবৈধ।আবার কারো কাছে প্রেম স্বর্গ থেকে আসে।যাইহোক আমি এ নিয়ে বিতর্কে যাচ্ছি না,তবে আমি কোনোদিন প্রেম ও ভালোবাসা গুলিয়েও ফেলি না।আমার এ লিখা প্রেম নিয়ে নয়।আমি খুঁজি ভালোবাসার মানে।আমি চাই ভালোবাসতে সবাইকে নিঃস্বার্থভাবে।
এ পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসা সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা।মা তার সর্বসুখ বিসর্জন দিতে পারে সন্তানের জন্য।সাধারণত একজন মানুষ পঁয়তাল্লিশ ডেসিবেল আঘাত সহ্য করতে পারে,যেখানে একজন মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সাতান্ন ডেসিবেল সমপরিমাণ আঘাত সহ্য করেন।সন্তানের মুখ দেখার পর মা সেই আঘাত ভুলে যায়।এর প্রমাণ দ্বিতীয়বার সন্তান ধারণ।মনে করেন একটা সাঁকো যেটার উপর দিয়ে যেতে হলে আপনার একটা হাত অথবা পা ভেঙে যাবে আপনি আগে থেকে জানেন,তাহলে এই সাঁকোর উপর দিয়ে যাওয়াতো দূরের কথা, এই সাঁকোর আশপাশে যাবেন না নিশ্চয়ই।অথচ একজন মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যে পরিমান কষ্ট সহ্য করে তা একজন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষকে দিলে তার শরীরের কমপক্ষে বিশটি হাড় ভেঙে যেতো।এরপরও একজন মা শুধু দ্বিতীয়বার না,দশ,বারো,পনের বা তার বেশিবারও মা হয়েছেন।আর তা শুধু ভালোবাসার জোরেই সম্ভব।মা বিধাতার সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার,যে মায়ের ভালোবাসা পায় না সে সত্যি হতভাগা।
এরপর আসি বাবার ভালোবাসায়।বাবা আল্লাহর দেওয়া অপার নিয়ামত।সন্তানের বর্তমান,ভবিষ্যৎ নিয়েই যার জীবনপাত।দশম শ্রেণিতে মোস্তফা কামালের একটা কবিতা পড়েছি "জীবন বিনিময়"।সেখানে বাদশাহ বাবরের পুত্র মরণ রোগে আক্রান্ত।রাজ্যের সব বিজ্ঞ হেকিম,কবিরাজ চিকিৎসা করেও দিনদিন অবনতি হচ্ছিল।তখন এক দরবেশ বাবরকে বলল,সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ধন দান করতে পারলে বাদশাহজাদার প্রাণ ফিরে পাবে।বাবর তখন বুঝতে পারে তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় তার নিজের প্রাণ। সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলো নিজের জীবনের বিনিময়ে পুত্রের জীবন ফিরিয়ে দিতে।আল্লাহ সেদিন তার দোয়া কবুল করেন।ধীরে ধীরে বাবর অসুস্থ হয়ে পড়েন আর হূমায়ুন সুস্থ হয়ে ওঠে।কবিতার শেষলাইন,"পিতৃস্নেহের কাছে হইয়াছে মরণের পরাজয়"।পিতার ভালোবাসার কাছে মরণের পরাজয় হবে কিনা জানিনা,তবে পিতার ভালোবাসা যুগে যুগে জীবনকে করেছে আলোকিত,উদ্ভাসিত।
সৃষ্টিকর্তার দেওয়া নিয়ামতের মধ্যে অন্যতম নিয়ামত ভাই-বোন।কি সুধা লুকিয়ে রেখেছেন সৃষ্টিকর্তা এ সম্পর্কের মধ্যে,যে পান করে নাই তার পক্ষে এটা অনুধাবন করা কখনও সম্ভব হবে না।ভালোবাসার আরেক রুপ ভাইবোন।তাছাড়া আত্মীয়র সম্পর্ক বলেন আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক সবইতো ভালোবাসার ফল।ভালোবাসাইতো এ পৃথিবীকে করেছে এতো সুন্দর এতো মধুময়।এ পৃথিবীতে সবার মতাদর্শ এক নয়,একেকজনের দর্শন একেক রকম।আমার মতে এই পৃথিবীর সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে আর আমিও সবাইকে ভালোবাসি।সে হোক আমার কাছের মানুষ বা সদ্য পরিচিত।আর আমার এ ধারণা যে সত্যি এর দু একটা উদাহরণ দিতেই পারি।
একবার আমি খুব অসুস্থ ছিলাম,তখন ডাক্তার আমাকে বললো আমি কোনোদিন গরুর মাংস খেতে পারবো না।গরুর মাংস আমার ভীষণ প্রিয় একটা খাবার।প্রায় একবছর আমি গরুর মাংস খাইনি।আর এই সময়ের মধ্যে আমার ছোটো আপা আর আম্মা গরুর মাংস ছুঁয়ে দেখেননি।আপনাদের মনে হচ্ছে মা-বোর এইটুকু করতেই পারে খুব সাধারণ।
আমি যখন কলেজে পড়তাম তখন আমরা ঢাকার কুড়িল থাকতাম।খিলক্ষেতে একটা এনজিওর স্কুলে বস্তির বাচ্চাদের পড়াতে আসতাম।একদিন বাসা থেকে স্কুলে যাওয়ার সময় ওয়ালেট এনেছি, কিন্তু আগের দিন ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে কলেজের ব্যাগে রেখেছিলাম সেটা ভুলে গেছি।বাসের কন্ডাকটর ভাড়া চাইলো,কিন্তু ওয়ালেট বের করে দেখি টাকা নেই।কি করবো বুঝে উঠার আগেই আমার বাম পাশে বসা এক মধ্যবয়সী মহিলা বলে উঠলো, কি হয়েছে তোমার ওয়ালেটে টাকা নেই!সমস্যা নেই ভাড়া কতো আমি দিয়ে দিচ্ছি।কন্ডাকটর সঙ্গে সঙ্গে ভাড়ার পরিমাণ বললো,ওনি দিয়ে দিলেন।আমি কোনো কিছু বলার আগেই ওনি বলে উঠলেন, সমস্যা নাই তুমি আমার সন্তানের মতো।আমি আরও অবাক হলাম আমি যখন বাস থেকে নেমে যাচ্ছিলাম,তখন তিনি আমার হাতে কতগুলো টাকা গুজে দিয়ে বললেন,তোমার কাছে টাকা নেই বাসায় ফিরবে কিভাবে,দেরি হলে কিছু কিনে খেয়ে নিও।আমি ধন্যবাদ বলারও সময় পায়নি বাস চলে গেলো।
এমন কত যে ঘটনা আছে সব হয়তো বর্ণণা করা সম্ভব নয়।তবে এটুকু বলতে পারি চলার পথে যখনি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি পরিচিত হোক বা অপরিচিত কেউ না কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাই আমার মতামত হচ্ছে,ভালোবাসেন,ঘৃণা নয় প্রাণ খুলে ভালোবাসেন।আর ভালোবাসাও আপনার দুয়ারে আচঁড়ে পড়বে,তাকে খুঁজে বেড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না।ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার মাঝে,ভালোবাসা দিয়েই তা খুঁজতে হয়।