শহর থেকে ছুটিতে গ্রামে এসে যে কদিন ই থাকি না কেনো,এর একটা অংশ সময় নানুবাড়িতে থাকতাম।যদি ছুটি পেতাম সাত দিন এর মধ্যে তিন দিন নানুবাড়িতে কাটাতাম।নানুবাড়িতে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে,আমার সমবয়সী মামাতো ভাই নাম পান্থ।পান্থ আমার চেয়ে দুই বছরের ছোটো।তারপরও ছেলেবেলা থেকেই ওর সাথে আমার ভালো বন্ধুত্ব।নানুবাড়িতে যাওয়ার পর থেকে আসা পর্যন্ত পুরোটুকুসময় ওর সাথে থাকতাম।খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে,ঘুম এমনিক কি গোসলও এক সাথে করতাম।বেপারটা হচ্ছে নানুবাড়িতে যাওয়ার পর পান্থকে ছাড়া চলতো না।সারাক্ষণই গল্পগুজব।কিন্তু আমাদের গল্পগুজবটা কখনই স্বাভাবিক কথাবার্তা হতো না,মানে এটাকে গল্পগুজব না বলে আলোচনা বলা যেতে পারে।সবসময়ই সমাজ,ধর্ম,রাষ্ট্র বা আশপাশের সমস্যা তার সমাধান কি হতে পারে,জীবনে চলার পথের ভুলগুলো কি হচ্ছে,এই ভুল থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কি এসব নিয়ে বিস্তর গবেষণা।
তবে আলোচনাটা যে সবসময়ই জ্ঞানমূলক হতো তা না,কিছু বিনোদনও থাকতো যেমন প্রেম-ভালোবাসা জাতীয়।তবে এটাতেও উচিত,অনুচিত বা জ্ঞানের কথা থাকতো।যেমন,আমি বলতাম জীবনে সঠিক ভালোবাসা একবারই আসবে,একটা মানুষকেই ভালোবাসা যাবে এরপর আর কাউকে ভালোবাসা যাবে না।পান্থ বলতো,না ভালোবাসা পরিবর্তন না হলেও,ভালোবাসার মানুষ পরিবর্তন হতেও পারে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে।এসব নিয়ে বিভিন্ন উদাহরণ টেনে তর্কবিতর্কে টানা সারারাত চলে যেতো,ফজরের আজান দিয়ে দিতো।
তবে কোনো তর্কই মিমাংসা না হয়ে শেষ হতো না,শেষ পর্যন্ত যেটা একদম বাস্তব সম্মত,সেটাই আমরা মেনে নিতাম।তবে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সেটার সঠিকটা জানার আগ পর্যন্ত গবেষণা শেষ হতো না।একদিনের একটা উদাহরণ দিই।একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠার পর আমরা একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম,সারাদিন খাওয়া-দাওয়া,গোসল এসবের মধ্যেও আলোচনা চলতে থাকলো।রাতের খাবার খেয়ে ঘুমের প্রস্তুতি নিয়ে আবার শুরু হলো আলোচনা।তারপর যখন ফজরের আজান দিবে দিবে অবস্থা এমন সময় বিষয়টার একটা সমাধান হলো।ঘুমাতে যাবো,এমন সময় বাহিরে আওয়াজ শুনে বের হয়ে দেখলাম মামা-মামীরা পুকুর পাড়ে,মাছের কোনো একটা রোগ হওয়ার কারণে সব মাছ পানির উপরে উঠে শ্বাস ফেলছে,মারা যাবে যাবে অবস্থা।
সে যাইহোক,এখন যেহেতু পারিবারিক বিপদ,এখনতো আর আমরা গিয়ে ঘুমাতে পারিনা।তাই বাধ্য হয়ে সজাগ থাকতে হলো।সারাদিন এই মাছ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হলো,নিজেরা কাজ না করলেও এই বিপদের অবস্থায় একা একা গিয়েতো আর আরামে ঘুমানো যায় না।এভাবে সন্ধ্যা হয়ে গেলো,এর মাঝে আমি আর পান্থ আলাদা আরেক আলোচনা শুরু করেছি।মাছের এই পরিস্থিতি হওয়ার কারণ কি?কে এর জন্য দায়ী!এর আগের দিন কোরবানি ঈদ ছিলো।কোরবানি করা গরুর নাড়ি-ভূড়ি এই পানিতে ধোঁয়া হয়েছে,আবার রক্তও ফেলা হয়েছে।কোনকারণটা মাছগুলোকে অসুস্থ করে তুললো।এসব আলোচনা করতে করতে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম।প্রায় ছত্রিশ ঘন্টা যাবৎ ঘুম নেই।কিন্তু এই আলোচনাও শেষ হয়নি,আবার শেষ না করে ঘুমানোও যাচ্ছে না।আবার সারারাত যাবৎ এসব গল্পগুজব চললো।তারপর ফজরের পর বিষয়টার সমাধানে আমরা দুইজনই যখন সন্তুষ্ট হলাম তখন টানা প্রায় আটচল্লিশ ঘন্টা সজাগ থাকার পর ঘুমালাম।এভাবেই আমাদের আলোচনাগুলো আমাদের দুজনকেই অনেককিছু শিখিয়েছে।
আমাদের মূলনীতি এটাই যে, শিখতে হবে জীবনের প্রতিটা ক্ষণে,কার কাছ থেকে শিখছি সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়,তবে সঠিকটা শিখতে পারছি কিনা সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।নিজে ভুল করার পর সেই ভুলকে সারাজীবন সঠিক ভেবে বা গোঁড়ামি করে বার বার এই একই ভুল করার মাঝে কোনো সার্থকতা নেই,বরং ভুল স্বীকার করে, সঠিকটা জানার পর সেটার চর্চা করার মাঝেই সার্থকতা বিদ্যমান।
অনেক ছোটো থেকেই আমরা এইধরনের নীতিমালা তৈরি করে নিয়েছিলাম।এসব নীতি অনুযায়ী চলার কারণে পান্থ আর আমার বন্ধুত্বের মাঝে কখনই কোনো জটিলতা তৈরি হয়নি।সমবয়সীরা এক সাথে থাকলে যে ঝগড়াবিবাদের সৃষ্টি হয় সেটা আমাদের মাঝে কখনওই হয়নি আর আশাকরি কখনও হবেওনা।