দিদির বাসা থেকে আড়াইশো গ্রামের মতো মধু আনলাম।ওর বাসায় গিয়েছিলাম গিয়ে দেখি আড়াই কেজির মতো মধু রান্না ঘরে রাখা।ভাইগ্নিকে বললাম,একটু বের করে বাটিতে দিতে ও দিলো।চলে আসার সময় আমি দেওয়ার জন্য বলিনি,কিন্তু আমার ভাইগ্নি বুঝতে পেরেছে হয়তো আমার মধুটা ভালো লেগেছে।তাই আসার সময় বললো,আম্মি মামাকে এক বোতল মধু দিয়ে দাও।আমি বললাম,এতো লাগবে না।ছোটো একটা বোতল দেখিয়ে বললাম,এটাই অল্প দিলেই হবে।মধুটা নাকি খাঁটি।বোনের জামাই কুমিল্লায় চাকরি করেন,সেখান থেকে এনেছেন।আমি অনেকদিন যাবৎ মধু খুঁজছিলাম।আমার সর্দির সমস্যা আছে।কয়েকদিন পর পরই সর্দি হানা দেয়।আমার কেনো জানি মনে হয়,মধু খেলে সর্দির ক্ষেত্রে একটু উপকার পাওয়া যায়।তাই মধুর খোঁজ করছিলাম।
কিন্তু শহরেতো খাঁটি মধু পাওয়া দুষ্কর।তাই আর রাস্তাঘাট থেকে কিনার সাহস হয় না।
যাক সে কথা,মধু নিয়ে এসে গ্রামের বাড়িতে গেলাম।সাথে মধুর বোতলটা নিয়ে গেলাম।যেসব জিনিস আমার শখের থাকে সেগুলোকে খুব দ্রুত শেষ করে ফেলতে ইচ্ছে করে না।অল্প অল্প করে খাচ্ছিলাম।আর গ্রামের বাড়িতে থাকার অবস্থায় আমার সর্দি করে না,সর্দি শুরু হয় যখন শহরে থাকি সে সময়।আর যেহেতু মধুটা আনার প্রধান কারণ সর্দিতে উপকার পাওয়া তাই শহরে গিয়ে খাবো বলে সংরক্ষণ করে রেখে দিলাম।কিন্তু কয়েকদিন পর দেখি মধুটা জমে যাচ্ছে,একটু ঘন মনে হচ্ছে।দুইদিন পর দেখি,হায় হায় মধু জমে একদম সাদা রং এর হয়ে গিয়েছে।মুখে দিয়ে দেখলাম স্বাদও পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে।দিদিকে ফোন করলাম,তোমার কাছ থেকে যে মধু নিলাম,এটাতো নষ্ট হয়ে গিয়েছে,তোমার কাছে যে আছে সেটার কি অবস্থা?দিদি বললো,তার কাছে থাকা মধুতো যেমন ছিলো তেমনই আছে এখনও। দিদির কাছ থেকে মেজু ও মধু নিয়েছিলো,তাকেও ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম,তার কাছে থাকা মধুটার কি অবস্থা।মেজু বললো,সেই মধু্টাও ঠিক আছে আগে যেমন ছিলো তেমনই।
আমি হতাশ হয়ে ফোনটা রেখে দিলাম।আমি ভাবতে থাকলাম,এতো শখ করে মধুটা আনলাম।এভাবে নষ্ট হয়ে গেলো।তাও কিনা শুধু আমার কাছে থাকাটাই নষ্ট হলো,দিদির কাছে যে একি মধু আছে সেটাতো ঠিকই আছে,আবার মেজুর কাছে থাকা মধুটাও ঠিক আছে,অথচ আমি এতো শখ করে আনলাম,আর আমারটাই নষ্ট হয়ে গেলো।মনের মধ্যে কিঞ্চিৎ ব্যাথা অনুভব করলাম।তারপর আর কি করার ঐভাবে একটু খাওয়ার চেষ্টা করলাম।কিন্তু খেতে কি রকম জানি বিশ্রী হয়ে গিয়েছে,খেতে পারলাম না।রাগ করে ঘরের একপাশে মধুর বোতলটা রেখে দিলাম।আর আম্মাকে বললাম,ফেলে দিলে ফেলে দাও আর অন্য কিছু করার থাকলে করে ফেলো।
তারপর ঢাকা চলে আসলাম কিছুদিন পর।মধুর বোতলটাতো আর আনার প্রশ্ন আসে না।নষ্ট মধু এনে আর কি করবো।ভাবলাম দিদির কাছ থেকে আবার আনবো বা অন্য কোথাও থেকে কিনতে হবে।এর কিছু দিন পর,আম্মার সাথে কথা হচ্ছিল।আম্মা হঠাৎ বললো,তোমাকে একটা কথা বলবো বলবো করে মনে থাকে না।তোমার রেখে যাওয়া মধুতো ভালো হয় গিয়েছে,আগের মতো সরিষার তেলের মতো রং ফিরে এসেছে,আর খেতেও আগের মতোই মিষ্টি।আর জমে যাওয়া কেটে গিয়ে আগের মতো তরল হয়ে গিয়েছে।
আমিতো অবাক নষ্ট মধু ঠিক হলো কিভাবে।
তখন আম্মা আসল ঘটনাটা বললো।পাশের বাড়ির এক কাকিমা আসলেন।আম্মা তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করছিলো যে ছেলেটা শখ করে এক বোতল মধু এনেছিলো,কিন্তু নষ্ট হয়ে গেলো।তিনি বললেন,আরে নষ্ট হয় নাই,খাঁটি মধু শীতে ঘরে থাকলে জমে যায়।
আর গ্রামে তখন শীতকাল শেষ হয়নি,যদিও শহরে তখন গরম ছিলো।যার কারণে দিদির বা মেজুর কাছে থাকা মধু জমে যায়নি।আর আমি মধুটা রেখেছিলাম,ফ্লোরে।স্বাভাবিকভাবে ফ্লোর অনেক ঠান্ডা থাকে।
যাইহোক সেই কাকিমা বললেন যে মধুটাকে অল্প কিছু সময় রোদে রাখলেই ঠিক হয়ে যাবে।সাথে সাথে আম্মা মধুটাকে নিয়ে রোদে রাখলেন আর জমে থাকা শক্ত মধু আগের মতো তরল হয়ে গেলো,সাদা রং পরিবর্তন হয়ে মধুর স্বাভাবিক রং এ ফেরত আসলো,স্বাদও ঠিক হয়ে গেলো।
এই ঘটনার পর আমার মনে হলো,মধুর এই জমে যাওয়ার বেপারটার অভিজ্ঞতা ছিলো না বলেই এই মনোকষ্ট পেতে হলো।আমার আম্মা বা বোনও জানতো যে,ঘরে থাকলে মধু এভাবে জমে যায়,অল্প একটু গরমের আঁচ দিলেই তা আবার ঠিক হয়ে যায়।অভিজ্ঞতার অভাবে বা সঠিক জ্ঞানের অভাবে ভালো মধুটাকে আমি নষ্ট বলে ঘোষণা করে,পরিত্যাজ্য করে চলে আসি।কিন্তু সেই মধু আসলে নষ্টই ছিলো না।
তেমনি জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতার অভাবে,সঠিক জ্ঞানের অভাবে,আমাদের কাছে ভালোকে মন্দ বা মন্দকে ভালো বলে মনে হয়।ঠিক তেমনি,জীবনে চলার পথে অনেক ভালো মানুষকে আমাদের কাছে খারাপ বলে মনে হয়,আবার ঐ অভিজ্ঞতার অভাবেই অনেক খারাপ মানুষকেও মাঝে মাঝে ভালো বলে মনে হয়।
কিন্তু বাস্তবতাটা অনেকক্ষেত্রেই ভিন্ন থাকে।