আমাদের জন্মের পরের দিনই আমাদের পিতা মাতা ঠিক করে নেয় আমরা ডাক্তার হব নাকি ইঞ্জিনিয়ার হব। তারপরে আমার ভাই বোনদের জন্য তারা ঠিক একই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখে সে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। এটা শুধু আমার পিতা-মাতার ক্ষেত্রেই নয়। যারা একটি নবজাতক নেওয়ার পরিকল্পনা করে তারা আগে থেকেই ঠিক করে রাখে সন্তানের ভবিষ্যৎ। আমাদের দেশের সকল অভিভাবক তারা নিজেদের সন্তানদের নিয়ে আগে থেকেই সকল পরিকল্পনা তৈরি করে থাকেন। এটা আমার কাছে এমন মনে হয় জন্মের আগে থেকেই আমাদের একটা বৃত্তে আটকে দেয়া হয়। পিতা-মাতা এভাবেই আমাদের সমাজের চোখে ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব তৈরি করে। কিন্তু এই সাফল্যের যাত্রায় আমাদের জীবন বন্দি হয়ে যায়।
শুধুমাত্র সমাজের এবং মানুষের চোখে অস্তিত্ব তৈরি করার জন্য আমাদের বন্দী জীবন পার করতে হয়। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে দেখেছি সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত অফিস করেন। কিছু বাড়তি টাকার জন্য মাঝেমধ্যে ওভারটাইম করে থাকেন। এত কষ্টের পরেও সেই বেতন দিয়ে সংসার চালানো আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জিং মনে হত। এই কারণেই হয়তো বাবা শুক্রবারের দিন টা তে অন্য দিন থেকে আরও বেশি ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমি চাইতাম আমার বাবা আমাদেরকে একটু সময় দিক। শুধু আমার বাবা নয় । প্রতিটা ঘরে প্রত্যেকটা মানুষ তার নিজের কর্তব্য পালনে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকেন । পরিবারের ছোট ছোট দায়িত্ব গুলোকে পূরণ করার জন্য এবং পরিবারের বাকি সদস্যদের খুশি রাখতে অনেকেই নিজের জীবন ধুলিস্যাৎ করতে ব্যস্ত থাকে।
প্রতিদিন এমন ব্যস্ততার রুটিন পালন করতে গিয়ে এক পর্যায়ে আমাদের কাছে সবকিছুই জটিল মনে হয়। আমরা অবশেষে ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং সবকিছুতে বিরক্ত বোধ করতে শুরু করি। মাঝেমধ্যেই সবকিছু থেকে ছুটি নিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। মনে হয় এই সমাজ, দৈনন্দিন রুটিন, সবকিছু বাদ দিয়ে দূরে কোথাও চলে যাই। একটি গহীন জঙ্গলে যেখানে আমাদের অস্তিত্ব খোঁজার জন্য কেউ থাকবে না । সেখানেই বাকি জীবনটা পার করে দেই। কিন্তু জীবনের এই জটিল চক্র ভাঙ্গার মত দুঃসাহস এখনো আমার হয়নি। জীবনের এটা এমন একটি চক্র যেখান থেকে আমরা সবাই পালিয়ে যেতে চাই কিন্তু কখনোই পালাই না। ফিরে আসি আবারো সেই দায়িত্ব ঘেরা পৃথিবীতে।
আমরা সব সময় এমন একটি জায়গা খুঁজে পেতে চাই, যেখানে চারপাশে সভ্যতার কোন চিহ্ন থাকবে না। আপনি ততক্ষণি এটা ভাবতে পারবেন, যতক্ষণ না আপনি একজন অভিভাবক হয়ে উঠবেন। কারণ একজন অভিভাবক এর পক্ষে কখনোই সম্ভব না সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়া। কিন্তু মাঝেমধ্যে এটা নিজের মতো মধ্যে প্রশ্ন আসে, একজন মানুষ সমাজ এবং পরিবার ছাড়া কতটুকু সুখী হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলেও আমরা সবাই এটা ভাবি এই ভিড় থেকে দূরে গিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারব।
আমাদের জীবনে এমন একটি চক্র যেখানে আমরা সবসময় চাই আমাদের সুখগুলো ভাগ করার জন্য পাশে কেউ থাকুক।আমরা যতই ক্লান্ত হয়ে যাই না কেন ভিড়ের মধ্যে তবুও চাই প্রিয় মানুষগুলো আমাদের জীবন চক্রে জড়িয়ে থাক। আমরা সবসময়ই সামাজিক নিয়ম অনুসরণ করতে অভ্যস্ত। তাই আমাদের হঠাৎ করেই সামাজিকরণ ছাড়া বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব । মাঝেমধ্যে ভাবি নিজের আত্মাকে সন্তুষ্ট করার জন্য একা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের আত্মা হয়তো এটা জানে আমরা সুখী হবো নিজের সুখগুলোকে ভাগ করে।