আমি আমার চোখের দৃষ্টি দিয়ে সুন্দর পৃথিবী কে প্রতিনিয়ত উপভোগ করছি। আর আমার কাছে এটা শক্তি। কিন্তু এর মানে এটা নয় যারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তাদের কোনো শক্তি নেই। একজন অন্ধ মানুষের নিজস্ব শক্তি রয়েছে। আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধীরা সর্বদাই অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। কিছু কিছু সহৃদয়বান ব্যক্তি ছাড়া কেউ তাদের নৈতিকভাবে সমর্থন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে না। কিন্তু সত্যি বলতে তারা দরদ অথবা সহানুভূতির কোন চরিত্র নয়। তারা আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে অবশ্যই আমাদের তাদের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে সব সময়।
আপনি কি আমার সাথে একমত হবেন না, প্রতিবন্ধীরাও অনুপ্রেরণা পেলে আমাদের সাধারন মানুষের মতোই তারা অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। আমরা যদি তাদের প্রতি সামান্য মনোযোগ দেই, তাহলেই বুঝতে পারবো তারা আমাদের থেকে আলাদা নয়। আমি উদাহরণ হিসেবে ছোট একটি গল্প বলতে চাই। যেখানে একজন অন্ধ ব্যক্তির সাহস এবং শক্তি তার প্রতিবন্ধীকতা নয়। সেখানে একজন মানুষ প্রমাণ করেন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধীরা সব সময় প্রতিবন্ধী হয় না। তারা সাধারণ মানুষের মতোই অনুপ্রেরণা দিতে পারেন।
বাবার মৃত্যুর পর নীলার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং তারপর থেকেই তার মায়ের চেষ্টা থাকে তাকে বিয়ে দেওয়ার। যার কারণে নীলা এবং নীলার মা পরিবারের আধ্যাত্মিক গুরুর সাথে দেখা করতে একটি বাসে যাচ্ছিলেন। একজন অন্ধ লোক বাসে উঠার সময় নীলার কাছে তার গন্তব্য জিজ্ঞেস করে। নীলা তাকে বাসে উঠার জন্য সাহায্য করেছিল। নীলা নিজের জায়গাটি ছেড়ে সেখানে বসার জন্য অনুরোধ করে। লোকটি নীলাকে বলে বাসের পিছনের দিকে বেশ ভিড় রয়েছে, তাই নয় কি? লোকটির এমন কথা শুনে নীলা বেশ অবাক হয়। সে লোকটিকে জিজ্ঞেস করে আপনি কিভাবে বুঝতে পারলেন যে আমরা পিছনের দিকে রয়েছি।
তখন লোকটি নীলার প্রতি উত্তরে বলল," বাসের সাইলেন্সার থেকে ডিজেলের গন্ধ আর গরম বাতাস অনুভব করছি"। লোকটি আমার ও বলে উঠলো আজ বৃষ্টি হবে ধীরে ধীরে সূর্যের আলো কমে আসছে। তখন নীলার মা লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, এটা কিভাবে তুমি বুঝতে পারলে? তখন লোকটি তাকে সহজ-সরল ভাবে উত্তর দিলো, আমি সূর্যের আলো এবং আবহাওয়া তাপ উপলব্ধি করতে পারি।
নীলা লোকটির ব্যাপারে বেশ কৌতূহল দেখাচ্ছিলো। কারণ নীলা বুঝতে পারছিল , যে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ভালো ভাবে বিকশিত হয়েছে এবং গন্তব্যর দীর্ঘ পথ দীর্ঘ। নীলা তাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কি আপনার সম্পর্কে জানতে পারি ?কারণ অন্ধত্ব ছাড়াও আপনি বেশ বুদ্ধিমান মানুষ"। তখন লোকটি নীলাকে বলল আমি অন্ধদের একজন সংগীত শিক্ষক। যদিও আমি জন্মগতভাবে অন্ধ ছিলাম না।একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় আমার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছি এবং তারপর থেকেই আমি একজন অন্ধ প্রশিক্ষকের দ্বারা প্রশিক্ষণ নিয়েছি। যার ফলে এখন আমি উপার্জন করতে পারি। আমার ছোট সন্তান এবং বৃদ্ধ মায়ের সাথে এখন আমি সুখী জীবনযাপন করছি । কারণ সেই সড়ক দুর্ঘটনায় আমার স্ত্রী মারা গিয়েছিল।
নীলার মা লোকটিকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার দৃষ্টি হারিয়ে তোমার কখনো মন খারাপ হয় না? লোকটি উত্তর দিলো সৃষ্টিকর্তার সবাইকে সাহায্য করেন। আর আমি বিশ্বাস করি সৃষ্টিকর্তা প্রতিবন্ধীদের কে বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন। সাধারণ মানুষরা ও কখনও কখনও সমস্যার সম্মুখীন হলে তাদের শক্তি হারিয়ে ফেলে। আপনার হয়তো জানা আছে ছোটবেলায় দুর্ঘটনার কারণে দৃষ্টিশক্তি হারানোর লুই ব্রেইল অন্ধদের জন্য ব্রেইল লিপি উদ্ভাবন করেছিলেন। যা আমাদেরকেও সাধারণ মানুষের মতোই শিক্ষিত করে তোলে এর মাধ্যমে। লোকটি আরো বলেন , আমার কাঁধে আমার বৃদ্ধ মা এবং সন্তানের দায়িত্ব রয়েছে । আমি নিজে যদি আমার শক্তি হারিয়ে ফেলি তবে আমি কিভাবে উপার্জন করবো এবং তাদের যত্ন নিব?
নিলার মা তখন মনে মনে ভাবতে লাগলেন, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর নীলা তার কাছে দায়িত্ব হিসেবে হয়েছিল। কোন বোঝা নয়। তিনি এই অন্ধ লোকটিকে কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হলেন এবং তিনি বুঝতে পারলেন নীলাকে শিক্ষিত করা উচিত।
নীলার বাবার মৃত্যুর পর তার শশুর এবং সেখানের লোকজন নীলাকে জোর করে বিয়ে দিতে চেয়েছিলো। তিনি তার পারিবারিক আধ্যাত্মিক গুরুর কাছ থেকে নীলার কুন্ডুলি সম্পর্কে জানতে পারে।
তিনি নীলাকে শিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে অন্ধ ব্যক্তি শুধুমাত্র শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, কিন্তু মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী নয়।