শুক্রবার বিকেলে ৩টার দিকে হঠাৎ মনে পরে গেল সেই শৈশবের কথা। ছোট ছিলাম যখন শুক্রবার এর দিন আসার আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার রাতে, শুক্রবার এর ছায়াছবির কাস্টিং দেখতাম টিভিতে যে কাল কি সিনেমা প্রচারিত হবে। সেটি দেখে অপেক্ষায় থাকতাম শুক্রবারে ৩টা বাজার অপেক্ষায়। সাদা কাল সেই টিভি পর্দাটার সামনে বসে থাকতাম সিনেমা শুরুর না হওয়ায় কয়েক ঘন্টা সময় ধরে। বিটিভির পর্দায় হাজির হয় যখন উপস্থাপক বা উপাস্থাপিকা তখনেই আমরা ছেলেরা নেছে উঠতাম আনন্দের। কিন্তু কোন কোন সময় দেখা যেত, প্রচারের যান্ত্রিক সমস্যার কারনে সিনেমাটি কিছু সময় পর প্রচারিত করা হবে বলে জানায় বিটিভির উপস্থাপক নারী বা পুরুষ। আবার কিছু সময় অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়, কিন্তু শেষ মেস হঠাৎ বিটিভির পর্দায় বলে ওঠে এখন প্রচারিত হচ্ছে পূর্নদৈর্ঘ বাংলা ছায়াছবি ''ফুল নেবে না অশ্রু নেবে" বলে আবার শুরু হল আবার বিটিভির ad. এভাবে চলে যেত বাকি সময়, অবশেষে উপভোগ এর পালা।কেউই উঠতাম না সিনেমা শেষ না করা পর্যন্ত । চলে গেল সেই শুক্রবার বিকেলের সময় , আবার সেই দিন গোনা কবে আসবে শুক্রবার। মাঝে মধ্যে আবার গ্রামের কেউ কেউ ভারায় নিয়ে আসতো VCR, সেখানে তো ফ্রী দেখার কোন চান্স নেই সেখানে একটি সিনেমা দেখতে হলে দিতে হত টাকা। যা হাতে আসার উৎস ছিল মা বা বাসার ডিম বা চাউল,সেখান থেকেই ৪-৫ টাকা মধ্যে ফি দিতাম আর কিছুটা দিয়ে চানাচুর নিয়ে খেতাম। কিন্ত একটা শখ অপুর্ন্য থেকে যায় যা ছিল সিনেমার শেষ কিছু অংশ আর দেখতে পেতাম না,কারন ঘুম তা দেখতে দেয় না।যার ফলে পরের দিন সিনেমার শেষ কাহিনি গুলো শুনতাম পাড়ার বড় ভাইয়দের কাছ থেকে, শুনার পর অনেক দুঃখ প্রকাশ করতাম, কিন্ত করার ঘুমে গেছিলাম সেই পাটিতে ।
image source
আজ আর সময়ের অভাবে কিংবা যুগের পরিবর্তনে সেই দিন গুলো আসে না। আজ
VCR, VCD, DVD তে সিনেমা দেখার যুগ নাই বললেই চলে। আজ ২টা কিংবা ফ্রীতে বাংলা সিনেমা দেখার আগ্রহের কেউ বসে থাকেনা বিটিভির পর্দায়। ২-৩ টাকার মতো হাওয়া হয়ে গেছে সিডি,ক্যাসেটের দিন গুলি.. মাঝে মাঝে ১-২ টাকার হাতে আসলে বা চোখে পড়লেও না দেখার ভান করে ছুড়ে ফেলি টেবিলের কোথাও.. অথচ নব্বই দশকের শৈশব কালে ১টাকায় অনেক গুলো চানাচুর ভাজা বা মুড়ি পাওয়া যেত যা ২,৩ বন্ধু মিলে খেতাম। কিন্তু আজ তা আর হয়ে ওঠে না।
আজও বিটিভির পর্দায় সেই ছায়াছবি হয়, কিন্তু আমার উপস্তিতি আর হয় না। কারন আজ ঘুম থেকে উঠে দেখি youtube মুভি নামানো যায়.. সেই দিনই বুঝে গেছি বড় হয়ে গেছি.. বড্ড বেশি ঘুমিয়ে ফেললাম!!
VCD তে “Baby’s Day Out” ছবি দেখতাম, ৪২০ নাটক দেখতাম.. সিডিতে ছবি দেখার মজা এখন আর পাই না.. ছবি দেখবো সেটা কেমন খুশির খবর ছিলো বলে বুঝানো সম্ভব না.. ৪২০ নাটকের ফুল সিরিজ সিডি ভাড়া এনে দেখে মনে হলো রাজনীতি অর্ধেক বুঝে গেছি, আসলে কিছুই বুঝে নি তখন, দুটো পর্বের সিডি একসাথে নিলে ৫ টাকা কম রাখত দোকানী।
কখনো আবার মাঝেমধ্যে মাটির ব্যাংক ভেঙে ভেঙে কয়েন চুরি করে জুস, চুইংগাম, চিপস কত কি খেয়ে দিন গুলো পার করছি। দুপুরে না ঘুমিয়ে বিকেলে খালার বাসায় ক্রিকেট খেলতে যেতাম কিংবা পাড়ার মাঠে ছোট জায়গায় খেলতাম বলে, জোরে মারলে বল মাঝে মাঝে নানান জায়গায় এসে লাগতো…সবাই বলতো,
“নাক চেপে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিলে ব্যথা কম লাগবে” কিছুক্ষন পর ব্যথা করলে আবার খেলা শুরু..
Image source
কখনো বাড়ির ঊঠোনে, কখনো বারান্দায় কখনো, স্কুল মাঠে ব্যাট বল নিয়ে ছুটতাম। এখন ছুটার জায়গা আছে কিন্তু খেলার কেউ নেই, সবাই বড় হয়ে গেছে, সবার ভাব এখন, স্কুলের, কলেজের রি_ইউনিয়নে আসে না কেউ।
image source
শুক্রবার বার বাবার হাত ধরে যে কত মসজিদে গেছি আমরা,বাবা হাত খসখসে ছিলো। আমি বাবা কে বলতাম “তোমার হাত খসখসে, কেমন জানি”বাবা বলত,
“বয়স হলে এমন হয়”
আমার হাতও একদিন খসখসে হবে। আমাকেও আমার ছেলে কোন এক জুমার দিন বলবে, বাবা তোমার হাত খসখসে কেন!!
কি জবাব দেবো আমি? কি জবাব দেবো আমরা?
বড় হয়ে গেছি?
আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কেনো বড় হলাম! কেনো সেই দিন আরেকটু নাক চেপে নিঃশ্বাস নিলাম না, তাহলে হয়ত আরো কিছুক্ষন খেলতে পারতাম.. কেনো শুক্রবার বার বার আসে কিন্তু ওই শুক্রবার গুলো আসে না? কেনো এখন আর সবার সামনে কাঁদতে পারি না! কেনো আড়াল হলেই বালিশ ভিজে আমাদের!
মানুষ গুলোই কি যান্ত্রিক হয়ে গেছে?
নাকি শহরটাই যান্ত্রিক হয়ে গেছে?যে আমরা দেড়টাকে সাড়ে একটা বলতাম, আড়াইটা কে সাড়ে দুইটা বলতাম সে আমরাই এখন ঘড়ি দেখারই সময় পাই না!
Image source