শৈশব জীবনে রোজার ঈদের প্রস্তুতি -সালামি

Words
1218
Reading
6 min
Listen
Play
5y

আমার সারাদিনের কাজের প্রধান অংশটি হচ্ছে বাস্তব জীবনের কর্মব্যস্ততা, আর এটি বলতে গেলে আমার পেশাটাই হচ্ছে এক প্রকার ব্যস্ততা। কিন্তু তার পরেও পিছু ডাকে অতীত। কখনো কখনো মনে পড়ে যায় নিজের পিছনে ফেলে রেখে আসা সেই আমিকে উকি দেয়। ঈদ এলেই সে নস্টালজিয়ায় চেপে বসে নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ছোটবেলার ঈদে।সেটা ছোট ঈদ হোক আর বড় ঈদ হোক...ও আপনারা তো আবার বুঝবেন না ছোট ঈদ আর বড় ঈদ কোনটা...আমাদের রাংপুরের কিছু এলাকায় রোজার ঈদকে ছোট ঈদ আর কোরবানীর ঈদকে বড় ঈদ বলে...ছোট বেলায় ভাবতাম কেন রোজার ঈদকে ছোট ঈদ আর কোরবানীর ঈদকে বড় ঈদ বলা হয়..।তারপর যখন হাদীসে পড়লাম যে রোজার ঈদ থাকে একদিন আর কোরবানীর ঈদ থাকে চারদিন তখনই ধরে নিলাম ছোট ঈদ আর বড় ঈদ কাকে বলে...!

রোজার ঈদে আমার সেই শৈশবের কথা মনে আছে তখন আমি প্রাইমারীতে ২য় কিংবা ৩য় শ্রেণীতে পড়ি।ঈদের আসল মজাটা ছিল সেই সময়ে ছোটবেলার।মনে পড়ে ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা। আমার বয়স তখন অনেক ছোট, যদিও রোজা ঠিকমত দিতে পারতাম না, কিন্তু তখন সারা রোজার মাস ধরে অপেক্ষায় থাকতাম, আর দিন গুনতাম কবে ১৫ রোজার যাবে, আর এর পর কবে ঈদের মার্কেট গিয়ে জামা-কাপড় কিনবো! ঠিক আর যেন সময় কাটে না ।রোজার শুরুতে ২-১টা রোজা যাওয়ার পর থেকে এই সব ভাবনা ভেবে দিন পার করি, আর ভাবি কবে আসবে এই ঈদের দিন। পবিত্র রমজান মাস চলা কালিন মা, রাত দুইটার দিকে উঠে ভাত-রান্না করতেন। তাছাড়া পাড়ার মাইকেও মুয়াজ্জিমরা ডাকত, এই বলে “আপনারা যাগুন সেহেরি করুন”এখন সময় ৩টা বেজে ৩৫মিনিট আরও অন্যান্য গজল বা তিলাওয়াত বলে। এর পর এক সময় আমরা জেগে উঠতা্‌ম, মা তরকারী গরম করে সবাইকে ডাকতেন আর ছোটবেলায় পেটপুরে সেহেরী খেতাম ।আজ ও সেহেরি করি কিন্তু ছোট বেলার মত আর পেটপুরে খেতে ইচ্ছে করে না খেলেও এখন সেহেরিতে দুধ ভাত ছাড়া আর কিছুই খাওয়া ইচ্ছে হয়না।

eid-ca.jpg

image source
images.jpg

image source

ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে প্রস্তুতি নিতাম। আমার শৈশবের ঈদ বেশি ভাগ এসেছিল শীতকালে। সন্ধার আকাশে কুয়াশা ঢেকে যেত। বেশি ভাগ রোজার শেষের দিন ২৯ রোজা আর ৩০রোজার দিন শেষে আমি আর আমার পাড়াত ভাই-বোন, বন্ধু বা খেলার সাথীরা মিলে পশ্চিম আকাশে সবাই তাকিয়ে থাকতাম। আর আকাশের প্রতিটা কোণে কোণে খুঁজে ফিরতাম বাকা চাঁদ দেখার আসয়।হঠাৎ কেউ চিৎকার করে উঠত ঐ যে চাঁদ দেখা যাচ্ছে। বুকের মধ্যে যেন ঢেঁকির পাড় পড়ত। ব্যাকুল হয়ে চাঁদকে খুঁজতাম। মেঘের ভাজে ভাজে চোখ ভেসে বেড়াত, বড়রা চাঁদ দেখে ফেলত। তাদের আঙ্গুলের মাথায় তাকিয়ে একসময় আমরা ছোটরাও চাঁদ মামার দেখা পেতাম। বুকের মধ্যে খুশীর হিল্লোল বয়ে যেত। অজানা আনন্দে মনের মধ্যে খুশীর ঢেউ। তারপর শুরু হয়ে যেত বড়দের সালাম করা। সে এক মহা আনন্দের ব্যাপার। বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করে তাদের কাছে দোয়া চাওয়া।

সবকিছু কেমন যেন বদলে গেছে।এখনকার দিনে দোয়া চাওয়া তো দূরে থাক, শিশুরা চাদের খোঁজই রাখেনা। ছোটদের যেন ঈদের নতুন কাপড়টাই যেন শুধু তাদের ঈদ। আমাদের সময় ফজরের আজান দিত, আমি লেপের তলা থেকে মুখ বাড়িয়ে মাকে জিজ্ঞেস করতাম, গোসল করার সময় হল কিনা তখন মা বকা দিতেন- বলত ঘুমাও। এখনও মেলা রাত বাকি।ফজরের নামাজ শেষে হওয়ার পর মসজিদের মাইক নিয়ে মুয়াজ্জিন বসে যান। আর ঈদ মোবারক ,ঈদ মোবারক বলতে থাকেন। আর কি বসে থাকা যায় সেই লেপের ভিতর! ভালো করে আলো ফোটার আগেই বাইরে চলে আসতাম।আর পাশের বাড়ির বন্ধুরা মিলে অনেক কিছু প্লান করতাম ,যে আজ এখানে যাবো -ওখানে যাবো-এই চাচ্চুর কাছে সালামি নিবো ,ঐ চাচ্চু তো এর আগের ঈদের কোন সালামি দেয় নাই।
eid-salami-avoidance-1.jpg

image source

download.jpg

image source
বলে প্লান করে নিতাম।ছোট বেলার ঈদে যে সেলামি পেতাম, তা এখন ভাবলে মনে হয় সেটির মূল্য কোটি টাকার মতোই ছিলো।বলে রাখি ছোটকাল থেকে আমি গ্রামে বোর হয়েছি তাই গ্রামের ঈদ এর উৎসবটা ছিল অন্যরকমের।প্রতিটি বাড়ীর মেয়ে নিজ নিজ বাড়ীর সামনের রাস্তা ঝাড়ু দিতে শুরু করে। একজন আরেক জনের সাথে পাল্লা দেয় কে কার আগে ঝাড়ু দেওয়া শেষ করতে পারে। আমরা যারা একটু বড় তাদের বসিয়ে দেওয়া হয় নারিকেল ভাংতে-এই কাজটা আমাকে করতেই হত। ঈদের আগের দিনেই কাদা-মাটি দিয়ে ঝকঝকে তকতকে করে বাড়ির উঠোন লেপে দেওয়া হয়। সব কিছু সাফসুতরো করে রাখায় সজীব একটা অনুভব থাকে প্রকৃতির মাঝে।

khejur-gurer-payesh-recipe.jpg

image source

ঈদের সকালে হাঁড়ি ভরে গুড়ের পায়েস রান্না করা হত। তখন গ্রামদেশে মানুষ সেমাই কি জানত না।হাটে সেমাই পাওয়া যেত না। খুলনা শহর থেকে সেমাই আনা লাগত। ইচ্ছে করলেই খুলনা যাওয়া যেত না। ট্রেন করে যেতে অনেক কয়েক দিন লেগে যেত। তাহলে সেই সেমাই খাওয়ার মজা কত আনন্দের ছিল। মা খালাদের সেই সেমাই খাওয়ার গল্প শুনলে আমি রীতিমত আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই। এখন সেমাই কি সাধারন খাবার আমার কাছে। খেতেই ইচ্ছে করে না মাঝে মাঝে। আর একসময় গ্রাম দেশে এই সেমাই খাওয়ার জন্য কত না তরুন মন ঈদের অপেক্ষায় থাকত।ঈদ কেন হবেনা তাদের জন্য আনন্দের। কোন কিছুর জন্য অপেক্ষা করে থেকে সেটা হাতে পাওয়ার চেয়ে আনন্দের আর কিছুই হতে পারেনা। নানী বলেন তারপর সেমাই রান্না করতেন। যারা কম সেমাই রাঁধত তারা চুপি চুপি রাঁধত। পাড়ার দুষ্ট ছেলেরা খোঁজে থাকত কোন বাড়ি সেমাই রান্না হত। দলবেঁধে হাজির হত সেই বাড়ি।

Bd-Pratidin-23-05-20-F-14.jpg

image source
ফিরে আসি আমার গল্পে। ঈদের দিন সকালে গোসল করার জন্য যেতাম শুধু গামছা কাঁধে ফেলে আর তার সাথে নতুন কস্কো সাবান নিয়ে আমরা হাজির হয়ে যাই আমার পাশের বাসার জলিল চাচার সেলো মেশিন এ কাছে।চাচাকে বলতাম চাচা তোমার সেলো মেশিনটাতে আমরা গোসল করতে এসেছি মেশিনের স্প্রিড টা একটু বেশি করে দাওনা।আমরা অনেক জন একটু তারাতারি হবে।তিনি আবার আমাদের কথা রাখত।মেশিনের পানিও যদিও একটু গরম ভাব ছিল কিন্তু একটা সময় শীত শীত লাগত।ঈদের আনন্দে অনেক সময় ধরে গোসল করতাম সময় চলে যেত, অন্যদিন তো সকালে পানিতেই নামতে চাইম না।ঐ দিকে মা গলা ছেড়ে ডাকতো কইরে হয়নি তোর এখনও –এই বলে আমি বলতাম যাইতেছি !গোসল শেষে বাসায় চলে আসতাম।

images (11).jpeg

image source
এবার সাজার পালা। ঈদের জন্য তো নতুন জামা কাপড় কেনা চাইই চাই। বাবা মার কোন যুক্তি সেখানে খাটত না। যেমন করেই হোক দিতে হবে। সেই কাপড় কিন্তু আগে পরতাম না। ঈদের দিন ভাজ ভেঙ্গে পরতাম নতুন জামা। কেমন যেন একটা নতুন নতুন গন্ধ বেরুতে থাকে।মাঝে আবশ্যই সালামি পাওয়া হয়ে যায়।

image-183574-1559294568.jpg

image source
মেঝো কাকার সাথে ঈদের মাঠে চলতাম। রোজার ঈদ হলে দাদা বাড়ি থেকে সেমাই খেয়ে নিতে হত। ঈদের নামাজ পড়তে যেতে হলে বাড়ি থেকে মাদুর সাথে নিয়ে যেতে হত। এখনকার মত আর চট বিছিয়ে রাখা হত না। ফসল কাটার পর যখন ঈদ হত তখন মাঠে বসত ঈদের বাজার। বাঁশির প্যাঁ পূঁ শব্দে মুখ্র হয়ে থাকে সেই দিক। বালিকারা ব্যস্ত কাঁচের চুরির দোকানে, বালকের ব্যস্ত প্লাস্টিকের বন্দুক, চশমার দোকানে।বন্দুক কেনা হলে সেটা দিয়ে বন্ধুদের সাথে একটু ইয়া ঢিসু ঢিসু খেলে নিচ্ছে জসীম স্টাইলে। কুটুকুটু বাচ্চা বাবার কাছে আবদার জুড়েছে বেলুন কিনে দিতে হবে।

54hjhj.jpg

image source

Eid-Children-220170626163257.jpg

image source

ঈদগায়ে ছোট একটা ছামিয়ানা টাঙ্গানো হয়। ইমাম সাহেব আর গ্রামের মাতবর টাইপের লোকেরা বসে তার নিচে। মেঝো কাকা কাতারের যেখানে ফাঁকা থাকে সেখানে মাদুর বিছয়ে নেন। বড় মাদুর। অনেকের বসার জায়গা হয়ে যায়। যারা মাদুর আনেনা তারাও বসার সুযোগ পায়।ইমাম ভাষণ দিতে থাকেন।রোজা যারা না রাখে তাদের জন্য এই ঈদ নয়।যারা ইচ্ছে করে রোজা রাখে না আল্লাহ তাদেরকে ঈদ গাহে আসতে নিষেধ করেছেন। মনে হালকা ভয় করে। আমি তো সব রোজা রাখি নাই।সবাই এক সাথে দাড়িয়ে নামাজ পড়তাম। নামাজ শেষে ইমাম খুতবা দিতে দাঁড়িয়ে যান। রৌদ্র তেতে ওঠে। পিঠ জ্বালা করে। একসময় মোনাজাত করা হয়। তখন আরো আনন্দ। সবাই মিলে ছুটিতো ঈদের বাজারে। বাচ্চারা তো আগেই শুরু করে দিয়েছিল। বড়রা এখন মিষ্টি কেনায় ব্যস্ত।
সবাই এবার বাড়ির পথ ধরে। বিল দিয়ে গেলে পথ কম হয়। আমরা বিল দিয়ে হাঁটা শুরু করি। তারপর এই বাড়ি ওই বাড়ি ঘুরে ঈদের সেমাই খেতে খেতে দুপুর হয়ে যায়।

সামনে ঈদ। পাব কি সেই ছোট বেলার ঈদের আনন্দ ফিরে। সেই গ্রাম তো প্রায় আগের মতই আছে। এখন বড় হয়ে গেছি। কেউ আর আমাকে সালামী দেয় না।আর তো পাড়ার বন্ধুদের সাথে ঈদের চাঁদ দেখা হয় না দিন শেষে।তাহলে ঈদের আনন্দ হবে কি করে।