পেটে খেলে পীঠে সয়

Words
1113
Reading
5 min
Listen
Play
5y

ছোটবেলায় একটা প্রবাদ শুনেছিলাম, পেটে খেলে পীঠে সয়, কথাটা যে এমন সত্যি হবে তা যদি জানতাম না। জীবনে একবারই একসাথে পনেরটা পরোটা , আর প্রায় ১কেজি টাক গরুর মাংস খেয়েছিলাম।খেয়েছিলাম বললে বোধহয় ভুল বলা হয়, গিলেছিলাম বলতে পারেন আমার এই পেটেই। এইটুকু শুনেই বুঝি চোখ কপালে উঠল, ভাবছেন বুঝি গুল দিচ্ছি, এখনো তো রসোগোল্লা আর দইয়ের হিসেব দিইনি । সেটা শুনলে তো ভির্মি খাবে নিশ্চিত অথবা বকরাক্ষস ও ভেবে বসতে পারে । থাকগে এতো ধানাই পানাই না করে গল্প টা বরং বলেই ফেলি । নীলে তে থাকি, ক্লাস ফাইভ পাস করে সিক্সে উঠেছি, প্রাইমারি থেকে হাইস্কুলে এসে নিজেকে বেশ কেষ্টবিষ্টু গোছের মনে হচ্ছে আজকাল। একদিন সন্ধার সময় দাদির ফোনে আসে আর আমার বড়চাচা হাতে আমন্ত্রেন চিঠি এসে পৌছাল। ছোট ফুফির বিয়ে এই মাসের শেষে। নীলে থাকার জন্য দাদাবাড়ি বেশ একটা যাওয়া হয়ে ওঠেনা সেই কবে ক্লাস ওয়ানে উঠে গেছিলাম সে ভুলেই গেছি বোন তখন এত্তোটুকুনি, তাই কয়েক দিন ছিলাম সেসময়।

সে ভারী মজার জায়গা । বাড়ি ভর্তি লোক গিজগিজ করছে। সাথে তাদের সূত্রে পাওয়া আমার একপাল দাদা দাদি। দাদা বাড়ি ঠিকানা না হয় নাই দিলাম । বাড়ির সামনে বড় চাচার বিশাল বড় এক পুকুর। গরমের দিনে সেখানে সকাল বিকেল দুবেলা জলে ঝাঁপাঝাঁপি করা । দাদিমার হাতের আমসত্ত্ব, আচার বড়চাচির হাতের সুস্বাদু রান্না। উফ বলতে থাকলেও ফুরবে না। সেই দাদাবাড়ি আমার কাছে যেন স্বপ্নে দেখা রাজ্য একটা । বড়চাচা যাবার আগে পইপই করে মাকে আর বাবাকে বলে গেছে, রুবি আর বাবু তোমরা কিন্ত একসপ্তাহ আগেই চলে আসবে। বিয়ের একসপ্তাহ আগেই থেকে বিয়ের অনুষ্টানশুরু হবে, তাই আগে থেকে না এলে চলবে কি করে বল? বাবারা ছয় ভাই আর ২ বোন । বাবা সবার ছোট, আর ফুফি হলো আমার বাবার থেকে ছোট মানে পরিবারের সবার ছোট ,আর আমি মার দেখাদেখি য়ামার ফুপিকে নাম ধরে ডাকতাম বলে । তবে সেই ফুপিকে বিয়ের পর থেকে অনেক দিন ধরে দেখিনা যা তার মূখানি আমার স্মৃতি থেকেই প্রাই মুছে গেছে, সেই কবে দেখেছি তাকে ।

তবে ছোট ফুফি অনেক ভাল বল খেলতে পারত ,আর খুব ভালো গান গাইতে পারত এইটা মনে আছে। সেই ফুফির বিয়ে, আর আমারো প্রথম দাদাবাড়িতে প্রথম বিয়ে বাড়ি।কারন আমার বাবা বিয়ের পর শহরে দিকে চলে আসে,যা বর্তমান। খুব মজা তো হবেই আমার আর আমার ছোট্ট বোন মনির। সে তো কোন ছোটবেলায় দাদাবাড়ি গেছিল তার তো কিছুই মনে নেই। সে শুধু বড়চাচাকেই চেনে। কারন বড়চাচাই মাঝে মাঝে আমাদের দেখতে নমাসে ছমাসে হাজিরা দেন । বাবা কোনমাতেই একটা কাজ সরকারি প্রতিষ্টানে কাজ করেন। তাই বাবা বেশীদিন ছুটি নিতে পারবেন না ।

তাই মা আমি আর বোন তিনজনে মিলে যাব বিয়ের ৭দিন আগে আর বাবা আসবেন ফুফির বিয়ের আগের দিন। বেশ পাকাপোক্ত ব্যাবস্থা করেই আমরা ট্রেনে চড়ে পৌছালাম। ওব্বাবা কতো বড়ো হয়ে গেছিস রে, বলে আমার গাল টা একটু টিপে দিল বাবু ভাই। বেশ রাগ হয়ে গেলো আমার, ইসস গাল টিপবে তো আমার কেন? আমি কি ছোট নাকি? গাল টিপে আদর করতে হয় তো মনি করো ও গাল টিপে আদর করার বাচ্ছা । আর বাবুভাই এমন হাবভাব দেখাচ্ছে যেন কত্ত বড়ো, মোটে তো ক্লাস টেন এ উঠেছে তাতেই এই। যাকগে আপাতত রাগ টাগ ভুলে গাড়িতে উঠে বসতেই গাড়ি চল্ল দাদাবাড়ির পথে ।দাদাবাড়িতে গাড়ি পৌছতেই হইহই করে সব চাচা,চাচীরা আর আমার বড় ফুফি আর ভাইবোনেরা ছুটে এল আমাদের গাড়ি থেকে নামাতে ।

এখনো বিয়ের দিন ৭ বাকি কিন্ত পরশু দিনই ফুফির গায়ে হলুদ তাই দাদারবাড়ির সামনে খামার টায় ম্যারাপ বেঁধে প্যান্ডেল উঠে গেছে ইতিমধ্যেই । বাড়িতেও লোকজন গিজগিজ করছে প্রচুর আত্মীয় স্বজন ইতিমধ্যেই এসে গেছে। আর আমাদের তো কোনো কথাই নেই। একপাল দাদা দাদিদের সাথে দিবারাত্রি শুধু খেলা আর খেলা। মেঝো চাচা কথায় কথায় খোঁকা পানিতে নামিয়ো না, গাছে চড়িয় না , ট্যাংগ ভাংগিবে। এই বাংলা ভাষায় সর্বদা টিকটিক করছে পিছনে আমার, যাতে মাঝেমাঝে আমার প্রেস্টিজের কুকার হয়ে যাচ্ছে তবু কিচ্ছু করার নেই। বাবা খুব রাগী মানুষ তাই মেঝো চাচা কথার আমল না দিলে ভবিষ্যৎ এ যে কি হতে পারে তা আমার বেশ জানা আছে ।

আজ বাড়িতে খাওয়ার খুব ধুম এই গরমেও চাচারা কোথা থেকে ইলিশ, চিংড়ী আর কই মাছ জোগাড় করেছে। আমি যদিও মাছের এতো নাম জানিনা তবু বাবুভাই, দাদার মুখে শুনলাম নাম গুলো। আমাদের শহরে সবসময় এতো রকম মাছ মেলেনা কিনা।

ফুফুর শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রায় জনা কুড়ি লোক এসেছে তারই মধ্যে মোটকাসোটকা গোছের একটা ছেলেও এসেছে, দুপুরে খাওয়ার সময় টেবিলে বসতে গিয়ে ইচ্ছে করেই সিউলীর পা মাড়িয়ে দিয়েছে। আর রনিকে কনুইয়ের আচ্ছা করে গুঁতো দিয়েছে আর এতটাই অসভ্য যে তার জন্য একবার ও সরি ও বলেনি।উফ আর ছেলেটা কি খাওয়ান না খেলো বাপরে । ছোট একটা হাতির খোরাক সব মিলিয়ে।
Image source
images (10).jpeg
এই কি ব্যাপার , তুই ইচ্ছা করে সিউলীর পা মাড়ালি, রনিকে গুঁতো দিলি কেন রে?মিচকে মোটা টা একটা শয়তানী হাসি হেসে বল্ল বেশ করেছি।তোরা ইচ্ছে করে প্যান্ডেলের ভালো জায়গায় বসবি ফ্যানের হাওয়া খাবি। জানিস না বরযাত্রী দের জন্য ভালো জায়গাটা সবসময় ছেড়ে দিতে হয়।ইসস মামার বাড়ির আবদার যেন ,কে এমন লাটের বাট র‍্যা তুই? বরযাত্রী হয়ে যেন মাথা কিনে নিয়েছে, বাবুভাই প্রশ্নে, সিউলীর ফিচিক করে হেসে ফুট কেটে বল্ল লাটের বেটা কেন হবে, ছোটহাতি বল, বাব্বা যা খেলো, একটা হাতির একদিনের খোরাক পুরো।এইই হাতি বললি ক্যানো, জানিস খাওয়াটা একটা আর্ট। তোরা কি আর বুঝবি , যা সব ল্যাকপ্যাকে চেহারা। পারবি আমার মতো খেতে, তবে বুঝতাম।ধুর খাওয়াটা আবার কোনো বাহাদুরি নাকি ও ইচ্ছা করলে সব্বাই ওমন খেতে পারে কথার মাঝে ফট করে আমিও একটু পাকামো দেখাতে বলে ফেললাম।পারে বলছিস, তবে চ্যালেঞ্জ কর, বিয়ের দিন রাতে আমার সাথে কম্পিটিশন করে দ্যাখা তবে বুঝবো তোদের ল্যাকপ্যাকে সিং দের কত দম। হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে মোটকাটা নিজেদের গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বল্ল, । তবে, ওই কথাই রইওল বিয়ের দিন তোর আর আমার খাওয়ার কম্পিটিশন যে জিতবে সে হেরোর কান ধরে মুলবে নিজের হাতে কি রে রাজি তো । আর শোন কানটাকে ভালো করে তেল মালিশ করে রাখিস বুঝলি, টানতে সরেস লাগবে কিনা।ইসস এত্তোবড়ো অপমান, রাগের ছোটে গা রি রি করে উঠল আমার। মজা তোর দেখাচ্ছি।
image source
images (9).jpeg

বিয়ের দিন সকাল -এবার এলো মাংস, ভুরভুরে গন্ধওলা রেওয়াজি গরুর লাল টকটকে ঝোল। দুজনেই প্রায় ১ ১/২কেজি। এবার দই শেষে মিষ্টি, আমার অবস্থা এবার করুন। এতো খেয়েছি উঠে আর হাঁটতে পারবো কিনা সন্দেহ। , শিউলী কিরে মিষ্টি খেতে পারবি তো নাকি?
মোটকার মুখ দেখেও মনে হচ্ছে বেচারার অবস্থা সংগিন। রসোগোল্লা সবে ১৫ এমন সময়, আমি আর পারবোনা বলে হুড়হুড় করে টেবিল ভাসিয়ে বমি করে ফেল্ল মোটকা। আর তারপর ধপ করে চেয়ের উলটে মেঝেয় কুমড়ো র মতো গড়াগড়ি। আমার ও তখন পেট গড়গড় এ আর এমন কি ব্যাপার, কি কুক্ষনেই যে বলেছিলাম কথাটা তখন।

এরপর যা হলো সে আর বলি কি করে, ওমন রাক্কসের মতো খাওয়ার ফল আমাকে হাতেনাতেই ভুগতে হয়েছিল। পরেরদিন সকাল থেকেই এমন পেটটি খারাপ হলো ,শেষমেশ সদর হাসপাতালে ঝাড়া পাঁচদিন স্যালাইনের বোতলের জল খেতে হয়েছিল আমাকে । আর তারপর দাদাবাড়ি ফিরে যত দিন ছিলাম গাঁদালপাতার ঝোল আর কাঁচকলা সেদ্ধই জুটেছিল কপালে। ফুফির বাড়িতেও আর যাওয়া হয়নি। আর কানমলা র বদলা না সেটাও আর নেওয়া হয়ে ওঠেনি। তাই বলি, পেটে খেলে যে পীঠেই সয়, কথাটা যে ভয়ানক সত্যি সেটা আমার চেয়ে কেউ বেশি জানে না বোধহয় ।