স্বাধীনতা - জীবনে চাই না বাবা

Words
1217
Reading
6 min
Listen
Play
5y

আমার হাইস্কুলে ৭ম শ্রেনিতে ভর্তির পর -ক্লাসের পড়া,টিউসনের পড়া আর কোচিং ক্লাসের পড়ায় আমার জীবনে মধ্যে কেমন যানি ঘর বন্দী হয়ে যাচ্ছিল আর নিজেকে বন্দি খাচার পাখি মনে হচ্ছিল-যেন মনে হয় জীবনে নেই কোন স্বাধীনতা।তাই একদিন বাবাকে বলি আমি একটু স্বাধীনতা চাই। শুনতে পাচ্ছ বাবা আমি কি বলছি?
বাবা"বারান্দায় আরাম চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিলেন আর পত্রিকা পড়ছিলেন বাবা। তিনি মাথা তুলে চশমার উপর দিয়ে তাকালেন আমার দিকে। খুব অবাক হয়ে বললেন-কী, ‘স্বা-ধী-ন-তা!’“জি আমি স্বাধীনতা চাই।” শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে বলল ১২ বছরের ছেলে,তা শুনে খানিকটা থমকে গেলেন বাবা।আমার মনের ভিতর ভয় করছিল যে আজ আমার কপালে কি আছে।
image source

sudjbme7oaefh43bn88m.jpg

বাবা চোখের চশমাটা হাতে নিলেন এবং আমার দিকে চোখ বড় করে তাকালেন এবং মাথাটা উপরের দিকে ঝাকি মেরে বললেন, কীসের স্বাধীনতা চাও তুমি?
"আমার যা-ইচ্ছা তা-ই করব"। আমাকে কিচ্ছু বলতে পারবে না তোমরা -আমি এমন স্বাধীনতা চাই।
image source

independentlife.jpg

বাবা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে এবং ডান হাত উল্টিয়ে বললেন, "যাও, তোমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিলাম"।আর মাকে ডেকে বল্লো তোমার ছেলে আজ থেকে এই পরিবারের স্বাধীন ছেলে ,তাকে আমি স্বাধীনতা দিলাম ...তোমার কি তাতে কোন মত আছে।মা কিছুই বলে নি সেদিন ...।আর সেদিন আমি সকাল বেলায় কথা শুনার পর সকালের নাস্তা না খেয়ে এক লাফে বারান্দা থেকে উঠোনে গিয়ে পড়লাম এবং তিনটা লাফে উঠোন পেরিয়ে ভোঁ দৌড়। আমার দৌড় গিয়ে থামল বাড়ির পাশের এক খেলার মাঠে যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করছে।

সেই সময়টা আমাকে ঠিক যে রকম লেগেছিল ,যেমনটাঃ- গরম বালিতে ধান পড়লে যেমন ছট্ ছট্ করে খই ফুটে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আমারও ঠিক তেমনি ছটফট করে নিজেকে চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে মন চাচ্ছিল। আমার সেই হাত ঝাড়া, পা ঝাড়া। হাতে পায়ের রশির শক্ত বান খুলে দিলে যেমন রক্ত চঞ্চল বেগে ছোটাছুটি করতে থাকে। ঠিক বাবার দেওয়া স্বাধীনতা পেয়ে সেভাবে ছোটাছুটি করতে লাগলাম। সামনে যাকে পাই তাকেই হাঁপাতে হাঁপাতে বললি, “আমি এখন থেকে স্বাধীন। আমার যা ইচ্ছা তাই করব,বাবা বলেছে আমি স্বাধীন। আমাকে আর কেউ কিছু বলবে না। আহ্ কী শান্তি। আমি স্বাধীন। স্বাধীন আর স্বাধীন। ইশ্ কি মজা, কি আনন্দ!”অস্থির ভাবে বাবার দেওয়া স্বাধীনতার বার্তা গ্রামের সকল ছেলে মেয়েদের ঘোষণা করে দিলাম।
image sourec

An-Independent-Life-450x300.jpg

এর পর সন্ধ্যা হয়ে এল। খেলা শেষে মাঠ থেকে সবাই চলে যাচ্ছে বাড়ি। আমি ভাবছিলাম অন্য সবার সাথে আমি সময়মত বাড়ি গেলে আমার আবার কীসের স্বাধীনতা? সুতরাং আমি শূন্য মাঠে একা এলোমেলো পায়চারি করছি। পায়ের সামনে মাটির ঢেলা, শুকনো গোবর যা পাচ্ছি তাতেই লাথি মারছি। ঢেলা আর গোবরগুলো ব্যাঙের মতো লাফিয়ে দূরে গিয়ে পড়ছিল।চারদিকে অন্ধকার নেমে আসছে। সবাই মাঠ ছেড়ে চলে গেছে যার যার ঘরে। ঘরে আলো জ্বালিয়ে পড়তে বসেছে অনেকে। ঘরে ঘরে পড়ার গুনগুন শব্দ।আমি রাতে ঘরে গিয়ে উঠলাম। ছোট বোন মনিকে আদর করে পড়াচ্ছে বাবা। সেখানে গিয়ে আমি বিপরীত দিকে ফিরে বসে রইলাম। আমি মাঠ থেকে রাত করে ঘরে ফিরেছি, হাত পা ধোয়নি, পড়তেও বসেনি-এটা আমি ঘুরেফিরে বাবা-মাকে দেখাতে চাচ্ছি। আমি রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে এটা সেটা বলছি। মা একবার আমার দিকে তাকিয়ে চুলোয় লাকড়ী ঠেলে দিচ্ছে। আজ আমার প্রতি কারো মধ্যে কোনো রাগ বা শাসনের সুর নেই। আর সবই চলছে খুব স্বাভাবিক ভাবে। আমি আমার পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে ইচ্ছেমতো চলবো। কোনো বাধা বন্ধন নেই, শাসন-বারণ নেই, দারুন মজা!
image source

resize.jpg

মা রাতের খাবার বেড়েছে। আমার সামনে থেকে ছোট বোন মনিকে ডেকে নিয়ে গেল খাবার জন্য। টেবিলে আমার খাবার বাড়া আছে। আমার ডাক পড়েনি। ডাক দিলে যদি আমার স্বাধীনতা ছিন্ন হয়!যেই কারনে ডাকা হয়নি...।
অন্যদিন না খেয়ে শুতে গেলে মা ঘুম থেকে টেনে তুলে নিয়ে খাওয়াতো। আজ কেউ কিছু বলেনি। সবাই যখন শুতে গেল, তখন আমি সুর করে বলতে লাগলাম...আমি ভাত খা-ই-নি, খা-ব-না, আমার ইচ্ছা..। আমার কথায় কেউ কানে তুলল না।
আমি আগের মতো সকলের সঙ্গে বসে খাই না। আমি-আমার ইচ্ছেমতো যখন ইচ্ছা তখন খাই, কখনো না খেয়েও থাকি আমি। কারণ এটা আমার ম্বাধীনতা। আর এভাবেই দিন যাচ্ছে আমার।

আমি বই নিয়ে বসলাম টেবিলে। একটা একটা করে বই হাতে নিয়ে দু -একটা পাতা উল্টিয়ে ধুম করে ফেলে দেই খাটের উপরে। কখনো উচ্চস্বরে ছড়া পড়ি, কখনো গুনগুন করে একটু পড়ে বিছানা গড়াগড়ী দেই আবার টেবিলে বই ছুঁড়ে দেই। খাতা নিয়ে এলামেলো ছবি আঁকাআঁকি করি। আমার কোন কিছুতেই যেন মন বসে না। আমার পড়া শেষ -বলেই সে বইগুলি সশব্দে টেবিলে রেখে ধুম করে এসে শুয়ে পড়ি ছোট বোন মনির সাথে। আমি আর ছোট বোন এক সঙ্গেই থাকি। আমি লেপ টেনে এনে তার গায়ে নিচে জড়ো করে রাখি। আমার হাত পা ছিটকে নানা ভাবে মনির কাছে আমার স্বাধীনতার সুখ প্রকাশ করে। আমার দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ হয়ে মনি অভিযোগ করলে বাবা মা মনিকে বুকে টেনে নিয়ে শান্ত্বনা দেয়, ‘মা, রাগ করে না। ভাইয়া তো স্বাধীন। সে যা ইচ্ছা তা করুকগে। তবুও আমায় কিচ্ছুটি বলে না।
image source

ছেলেদের কষ্টের ছবি  (1).jpeg

স্কুলে যাবার সময় হয়েছে। পাড়ার স্কুলের সাথীরা এসে আমায় বলল , “কিরে, তুই এখনো রেডি হসনি? ইস্কুলে যাবি না? তাড়াতাড়ি রেডি হ।”“না, আমি ইস্কুলে যাবো না।”“কেনো যাবি না?”“এমনি, আমার ইচ্ছা। আমি না গেলে তোদের কোন অসুবিধা আছে?”আমার সহপাঠীরা আমার কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। তারা আমার মার কাছে নালিশ করে চলে গেল।

আমার অফুরন্ত সময় কাটে নানা দুষ্টুমি করে। খেলার মাঠে মোর সকালে- দুপুরে-বিকালে যাওয়া আসা করা, একা একাই খেলি, ঢিলাঢিলি করি। গাছের ডালে বসে থাকা, পাখি ধরার ফাঁদ পাতা। যাকে তাকে কিল ঘুষি মারা, বিড়াল দৌড়ায়। বাড়ির পোষা কুকুরের বাঁকা লেজ সোজা করার জন্য কসরত করা। আমার ইস্কুল যাওয়া বাইসাইকেল নিয়ে ঘাম ঝরিয়ে সারা গ্রামে ছোটাছুটি করা।আমি সারাদিন কী পরিমাণ স্বাধীনতার সুখ বিতরণ করে বেড়াই তা বুঝা যায় বিকেলে যখন আমার বিরুদ্ধে একের পর এক নালিশ আসতে থাকে, তখন।
আমার উপর মা-বাবার শাসন-বারণ নেই, আদেশ-নিষেধের বালাই নেই। আমার কোনো কাজে বা আচরণে মা-বাবা রাগ করে না, ধমক্ব দেয় না। উপদেশ বিলি করে না । আমার আদর নেই, ছায়াও নেই-মায়াও নেই। স্বাধীনতা ভোগের দুর্বার আনন্দ দিনে দিনে কেমন যেন মলিন হতে শুরু করেছে।
সকালবেলা দুই ভাইবোন কথা বলছি। মা এসে নাস্তা করার জন্য মনিকে যখন টেনে নিয়ে যাচ্ছে তখন আমি মাকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলি...নেও, আমাকেও টেনে নিয়ে যা।। মা, আমাকে ধরল না, মনিকে নিয়ে চলে গেল।খাবার সময় ছোট বোনটির যখন ডাক পড়ে তখন আমি এগিয়ে গিয়ে বলি, মা“আমাকে ডাকতে পারো না? খালি মনিকে ডাক কেনো? ডাক দেও!আমায় কেনো ডাক না“এই সেলিম ভাত খেতে আয়।” মা ডাকল না।
image source

স্বার্থ.jpg

দিনে দিনে আমার মন কেবল মা বাবার আদর শাসন, ধমক আর বিধিনিষেধের জন্য কেমন যেন হাহাকার করতে লাগল। এ ভাবেই আমার কেটে গেলো ১৪দিন। এখন আমি দুরন্ত ছাগলছানার মতো আর ছোটাছুটি করি না। কেবল বাবা-মার আশেপাশে ঘোরাফেরা করি। বলতে চাই কিন্তু কিছুই বলতে পারিনা আমি।
image source

DxbpPSiUwAA_4yS.jpg

সকালে বাবা সেই বারান্দার চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছেন । আমি সেই আবার ভয় নিয়ে ধীর পায়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাবা আমার দিকে তাকাল,এর পর আবার পত্রিকাইয় চোখ বুঝলো। আমি সে বার কয়েক ঢোক গিলে ভাঙ্গাস্বরে বললাম, বাবা... আমার স্বাধীনতা ফিরিয়ে নাও তুমি-বাবা মাথা তুলে আমার দিকে তাকালেন। এ কয়দিনে আমার মুখটা সুখিইয়ে ও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। বাবা মুখে কিছু না বলে ডান হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।আমি উড়ে গিয়ে বাবার গলা প্যাঁচিয়ে ধরে হু হু করে কান্না জুড়ে দিলাম।বাবার দেওয়া স্বাধীনতা পেয়ে ১৪দিনে যা হারিয়েছি তা যেন কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিচ্ছি। আর বলছি বাবা -আমি আর এই স্বাধীনতা চাই না, যে স্বাধীনতায় থাকে না তোমাদের আদর, শাসন, ধমক আর বিধিনিষেধ।

আজ আর আমি বাবার থেকে নিজের ইচ্ছেকে চাইনা।বলি না বাবা আমি আমার মত থাকতে চাই। বাবা-মার আদর, শাসন ছাড়া পৃথিবীর সব কিছু অসহায় লাগে,যদি তাতে খানিক শাসন না থাকে।বাবাকে আমি আজও বলিতুমি আমায় একটু মাঝে মধ্যে বকা বাদ্ধো করিও তা না হলে আমার জীবন নষ্ট হবে পারে।এই কথা শুনে বাবা বলে ওরে তুই বোকা ,সারাজীবন থাকবি কি তুই খোকা। আজ আমি যদি বাবা-মার কাছে সেই স্বাধীনতা নিয়ে চলতাম তাহলে হয়ত আর এই জীবনে মানুষ হয়ে ওঠতে পারতাম না বলে আমি মনে কি।কারন বাবা -মার শাসনেই আমার আগামী পথ চলা।