Author: হুমায়ূন আহমেদ
Publisher: অন্যপ্রকাশ
Category: রাজনৈতিক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস
এখন ২০২০ সাল। করোনার জন্য বাসায় বন্দি প্রায় ৫ মাস । বলতে গেলে পুরো বিশ্ব বন্দি ! আচ্ছা এভাবে কি বাংলাদেশের মানুষ আগেও কখনো বন্দি ছিলো?? উত্তর টা "হ্যাঁ ছিলো" । আর সময়টা ১৯৭১। এই সালটার প্রতি ছোটবেলা থেকেই খুব আগ্রহ ছিলো। বা এখনো আছে !৭১ ছিলো বাংলাদেশ হবার গল্প।জবের প্রিপারেশনে,সব কিছুতেই থাকে। সত্যি বলতে গেলে সব কিছুই জানার জন্য জানা, তখন আসলেই কি হয়েছিল?মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা করে!সেই আগ্রহ থেকে এই বই পড়া।
বই পড়তে বরাবর ই বেশ ভালোই লাগে আমার।এই বইটির কথা শুনেছিলাম! তাই এই অবসরে পড়েই ফেললাম।সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিলো, যখন পড়তে পড়তে বইয়ের ভিতরে চলে যাচ্ছিলাম, তখন বার বার মনে হচ্ছিল বাইরে যুদ্ধ হচ্ছে। যুদ্ধ জনিত কারনেই বন্দি আমরা!
এখন আসি বইয়ের ভালো লাগার বিষয়গুলো নিয়ে :
হুমায়ূন আহমেদ বরাবরইই আমার প্রিয় লেখক এই কারনে, তার গল্প যখন পড়ি, তখন তার প্রতিটি চরিত্র কে উপলব্ধি করি।মনে হয় তারা আমদের আশে পাশের কোন মানুষ!উপন্যাস শুরু হয় যথারীতি কিছু চরিত্র নিয়ে ,অন্য সব উপন্যাস এর মতোই .......নীলগঞ্জ হাইস্কুলে আরবি শিক্ষক মাওলানা ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরি।সে তার ভাই শাহেদের সাথে দেখে করতে আসেন।সময় টা ১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারি মাস।শাহেদ এর স্ত্রী আসমানি, মেয়ে রুনি বন্ধু নইমুল, গৌরাঙ্গ ,পুলিশ অফিসার মোবারক এবং তার পরিবার, কবি কলিমুউদ্দিন ও তাদের আশে পাশে থাকা মানুষরাই প্রধান চরিত্র।
সাধারণ মানুষের জন্য তখনকার রাজনৈতিক দাঙ্গা কি ভয়াবহ ছিলো! ভাবলেই ভয় লাগে! গল্পের মধ্যেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ।২৫ মার্চ কাল রাত্রি ,২৭ মার্চ বেতার এ শুনা স্বাধীনতার ঘোষণা সব কিছুই যেন চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছিলাম।সবই যেন জীবন - মৃত্যু র সন্ধিক্ষণে। কে বেঁচে থাকবে, কে থাকবে না, সেটাই ছিলো প্রধান প্রশ্ন! !! লেখক খুব সুন্দর ভাবে আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানে তখনকার জনপ্রিয়তা ,তার নেতৃত্ব, মাওলানা ভাসানী, শহীদ জিয়াউর রহমানের মত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এত সুন্দর ভাবে বনর্ণা দিয়েছেন তা এক কথায় অসাধারণ! ! সবচেয়ে ভালো ছিলো স্বাধীনতার দলিলপত্র, চাক্ষুষ সাক্ষী, ফুটনোট এর মাধ্যমে প্রত্যেকটা ব্যাপার সর্ম্পকে আমাদের সঠিক ধারনা দিতে লেখক কোন কার্পন্য করেননি।কীভাবে বাংলার সাধারণ ছেলেরা, কি সাহসীকতার সাথে পাকবাহিনীকে পরাজিত করে, হয়ে উঠে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।কিভাবে আমাদের ভয়ংকর হয়ে উঠা আর পাকবাহিনীদের হার মানতে বাধ্য করা।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিলো ১৪ ডিসেম্বর এ বাংলার সবচেয়ে মেধাবী শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ধরে নিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করা, একটা দেশকে হাজার বছর পিছিয়ে দেয়ার জন্য হয়তো এটাই যথেষ্ট!! ছিলো বীরাঙ্গনাদের বনর্ণা দেয়া সুদীর্ঘ কিছু পাতা,যার ভয়াবহতা পড়ে মেয়ে হিসেবে না, একজন মানুষ হিসেবে কেঁদেছি! ! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের উপর চালনো নৃশংসতার যে বনর্ণা দিয়েছে পরেরদিন এই লাশ পরিস্কার করতে আসা ডোম রা , বারবার মনে হয়েছে, কি নিমর্ম,কি নিমর্ম !!!লেখক এর পিতাকেও রাজাকার ধরে নিয়ে যায়,লেখক নিজেও জানে না স্বাধীন বাংলার কোথায় তার পিতা শুয়ে আছে!! হয়তো এভাবে অনেকেই ফিরতে পারেনি তার পরিবারের কাছে, যেমন গল্পের নইমুল পারেনি।এরকম হাজারও অলেখা গল্প আছে!!! হয়তো কখনোই জানতে ও পারবো না !এখন স্বাধীন আমরা, কবি শামসুর রহমান ও সেই কালজয়ী মুহূর্তকালে লিখেছেন "স্বাধীনতা তুমি " কবিতা
স্বাধীনতা তুমি
শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক
স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।
স্বাধীনতা তুমি
উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।
স্বাধীনতা তুমি
বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।
স্বাধীনতা তুমি বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।
স্বাধীনতা তুমি
গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,
হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।
স্বাধীনতা তুমি
খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা,
খুকীর অমন তুলতুলে গালে
রৌদ্রের খেলা।
স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।
উপন্যাস টা শেষ করতে ৩ দিন লেগেছে! এই তিনটা দিন প্রতিটা মূহুর্ত কি পরিমান মন খারাপ ছিলো! বই পড়া ছাড়া কোন কিছুই তে মন বসছিলো না! আপু বারবার বলেছিলো,"কি হয়েছে তোর? এত মন খারাপ কেনো? কি বই পড়তেছি?" আপুকে তো বলা হয়নি তখন, আমি যে বইটা পড়েছি, এটা দীর্ঘ নয়মাস ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তে, হাজার বীরাঙ্গনার আহাজারি তে পাওয়া আমার দেশ, যাদের বাংলার মাটি পরম মমতায় ধারন করে রেখেছে, জোছনা তার উপর অপূর্ব নকশা করে সেই জোছনা ও জননীর গল্প পড়েছি আমি।