অনিশ্চিত জীবন ।প্রায় ঘুমাতে যাবার আগে ভাবি কাল কি কি করব! কিন্তু একবার ও এটা ভাবি না যে কাল কি বেঁচে থাকব?!!
ভাবনাটা বেশ পুরোনো! পুরোনো ভাবনাটা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠলো একটি বই পড়ে। বইটি সোফির জগৎ
_সোফির জগৎ
by জি এইচ হাবীব ,
ইয়স্তেন গার্ডার।_
বইটি একেবারে ভিন্ন! যদি জিজ্ঞেস করা হয় কেন ভিন্ন? তাহলে শুধু এটাই বলবো বাস্তব জীবনের আড়ালে ঢাকা পরা কিছু প্রশ্ন, যেটা কখনোই ভাবা হয় না বা ভাবি না আমরা।আর এই বইয়ের প্রেক্ষাপট ই এটা!
সোফির জগত বইটিতে হরেক রকম চরিত্রের সমাহার হলেও মূল চরিত্র ১৪ বছর বয়সী সোফি অ্যামুন্ডসেন নিজেই। সাথে তার দর্শন শিক্ষক অ্যালবার্টো নক্স। এছাড়া সোফির মা হেলেন অ্যামুন্ডসেন, বাবা মেজর আলবার্ট ন্যাগ , বান্ধবী জোয়ানা, তার বয়সী আরেকটি মেয়ে হিল্ডা মোল্যার ন্যাগ।
শুরু টা এমন ,একদিন সোফি স্কুল থেকে ফেরার পথে বাসার ডাকবাক্সে একটা চিঠি পায় যার মধ্য দিয়ে সে আসলে তার দর্শন শিক্ষকের সাথে সে পরিচিত হয়। তারপর একের পর এক চিঠি! অদ্ভুত সব প্রশ্নে, পুরো পৃথিবীটাই নয় পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কিভাবে আসলো বা আমি কে?থমকে যায় মন!
দর্শন, দর্শনতত্ত্ব বা দর্শনশাস্ত্র !আচ্ছা ...
........ শব্দগুলো কি শুধুই শব্দ ,এদের অর্থ ই বা কি..? শুধুই কি খুব মনোযোগ নিয়ে কোন কিছু অবলোকন করাকেই দর্শন বলে নাকি সেটা দেখে, সেই ব্যাপারটা নিজের মধ্যে জানতে চাওয়া ...? আসলে দর্শনের সংজ্ঞা কি তাহলে...? শুধু আমি কিংবা আপনি না ,মানব সভ্যতার শুরু থেকে এখন অবধি এই উত্তর খুঁজে গেছেন সব বিখ্যাত মানব মানবী। তবে এটা বললে ভুল হবে না যে মানুষের বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতার মধ্যেই দর্শনের সূত্রপাত।
বইয়ের মধ্যে কিছু প্রশ্ন আমার খুব প্রিয়। তার মধ্যে কয়েকটি হলো 'তুমি কে'..? 'পৃথিবীটা এলো কোথা থেকে'...? হ্যা এটা মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচাইতে বেশী বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটি ।
আচ্ছা মুরগি আগে নাকি ডিম আগে? যদি বলি, মুরগী যদি আগে এসে থাকে তাহলে ডিম ফুটেই বাচ্চা বের হয়ে মুরগী হয় তাহলে ডিম কিভাবে এলো..? কি?!...! পুরোনো চিন্তা আবার ফিরে এলো?
আবার বিজ্ঞানীরা বলে, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, আসলেই কি তাই ! নাকি সূর্যই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে..? এই যে পৃথিবীর প্রকৃতি একটা নিয়ম মালার মধ্যে দিয়ে নিজেদের এতো কিছু নিয়ন্ত্রণ করে প্রত্যহ টিকে আছে এটা কি যুগ যুগ ধরেই এভাবেই ছিলো? না ধর্মমতে ঈশ্বরের শিল্পশৈলী ...?
এটা যে সব মানব মানবীর ভাবনা যে তা না। তাছাড়া এইযে আমি আকাশ দেখছি, প্রকৃতি, জীবজগৎ, প্রাণীজগৎ ইত্যাদি দেখছি, অনুভব করছি বাতাসকে। আচ্ছা পৃথিবীর শুরু থেকে জনম জন্মান্তর ধরেই এই উপাদান গুলো কি এভাবেই ছিলো .? সব প্রানীপালের মধ্যে একি জাতের প্রানীরা বা কেন একি রকম দেখতে ...? অন্যরকম কেন হয় না ? ? এরকম অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খোজা শুরু হয়েছে বলতে গেলে মানব সভ্যতার শুরু থেকে এবং এখন অবধি এসব প্রশ্নের উত্তর খানিকটা অমীমাংসিত হিসেবেই অথবা খানিকটা সান্ত্বনা হিসেবেই মীমাংসিত হয়। এসব ব্যাপার জানার ইচ্ছা বা আগ্রহ বা থেকেই মানুষ কিন্তু তিন হাজার বছর আগেকার ইতিহাস পড়ে । যেমন টা হয়তো আমি ই পড়েছি!
চমৎকার কিছু কোটেশন আর প্রশ্নে বইয়ের সৌন্দর্য আপনাআপনি বৃদ্ধি পেয়েছে।
দু'হাজার বছর আগের এক গ্রীক দার্শনিক বিশ্বাস করতেন দর্শনের জন্ম মানুষের বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতার মধ্যে।ব্যাপার হয়তো সত্যি!কারন ইংরেজিতে একটা কথা বলে,curious mind wants to know! এই জানতে চাওয়া মন থেকেই কিন্তু দর্শন, দর্শনতত্ত্ব বা দর্শনশাস্ত্র।
ঠিক এই সব প্রশ্নের বিভিন্ন সময়কালের মনীষী বা দার্শনিকরা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে যেভাবে তুলে ধরেছিলেন তারই এক সার সংক্ষেপ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন লেখক ইয়স্তেন গার্ডার তার "সোফির জগৎ" বইটিতে। তিন হাজার বছরের পুরোনো পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস কে মাত্র ৫৪০ পাতায় গুছিয়ে লেখা বেশ মুশকিল! কিন্তু লেখক এই কাজটি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে করেছেন!তার সাবলীলতা আর মাত্র চৌদ্দ বছরের মেয়ের চিন্তা ধারা দিয়ে সেটা প্রকাশ করা, এক কথায় অসাধারণ !
অদ্ভুত সব প্রশ্নের সমাহার, এই বইটি পড়তে পড়তে ভাবনা জাগতে ভেসে বেরিয়েছি।বার বার মনে হয়েছে কে আমি বা এই আমি টাই বা কে?