আজকাল মানুষদের কেন জানি জীবনের উপসংহার নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হতে দেখছি। একটি সম্পর্ক শুরু করে বহুদিন সে সম্পর্কটি ধরে রাখা যেন তাদের কাছে অদৃশ্য এক অর্পিত কর্মভার, মনে হচ্ছে যেন কেউ তাদের উপর ভীষণ এক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে যা সময়ের সাথে সাথে তাদের ভারী ভাবটা ও যেন ক্রমশই বেড়েই যাচ্ছে এবং সে ভার বইতে বইতে তাদের আর সহ্য হচ্ছে না এবং এর আসল গন্তব্য স্থানে রেখে এসে যেন উপসংহারে নিজের মুক্তি। কোনো একটি সম্পর্কের শুরুওটা কত মধুর হয় তা কি একবার চিন্তা করে দেখেছেন? রাতের পর রাত নির্ঘুম থেকে এক সাথে পুরো রাত কাঁটিয়ে, হয়তো কোনো অজানা গদ্যের ভীড়ে হারিয়ে, নয়তো বা পরিচিত কোনো ঘটনাকে ঘুরিয়ে পেচিয়ে অপরিচিত বানিয়ে তার সাথে সময় কাটানো।
তখন যেন প্রতিটা ক্ষণ, প্রতিটা মূহুর্ত অমৃত। পৃথিবীর সব মোহ মায়া তখন তুচ্ছ এ সময়গুলোর কাছে। নিজেকে কখন হারিয়ে আবার ফিরে পাই তারই যেন সমীকরণ মেলানো ভার হয়ে পড়ে তখন। তখন কত বর্ণিল স্বপ্ন মনে মধ্যে তার রঙতুলিতে নিজের মতো করে সাজায় সব কিছুকে। হয়তো মনে হয়, তাকে পেলে তার জীবনের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পাবে, স্বর্গের সুখ যেন তার জন্য তখন ধরণীতে নেমে আসবে নতুন রূপে শুধুমাত্র তারই জন্যে। আর যদি তাকে না পায় তাহলে ত দেখা যায়, কেউ কেউ বিষন্নতার গভীর ঘোরে নিমগ্ন হয়ে পরে, কেউ কেউ ত এই ধরনীর বুকে স্বর্গের স্বপ্নে, নরক নামিয়ে আনে। আর ধরনীতেই তাকে না পাওয়ার জ্বালায় নরকের অদৃশ্য আগুনে নিজের ভেতরকে পুড়িয়ে ফেলতে থাকে।
সে মানুষটা যে তার প্রিয় মানুষটাকে সারাজীবনের জন্য পাওয়ার স্বপ্নতে বিভোর ছিল, যখন সে মাহেন্দ্রক্ষণ আসে এবং তার প্রিয় মানুষটাকে আপন করে চিরদিনের জন্য পেয়ে যায়, সে ক্ষণে এ ধরণীতে তার চেয়ে সুখি মানুষ বোধহয় আর কেউ থাকে না। কিন্তু এ সুখটা কি দীর্ঘস্থায়ী হয় সবার জন্য নাকি ক্ষণিকের সুখেরই আত্মপ্রকাশ ঘটে, সচরাচর সুখ বলতে আমরা যা বুঝি?! আমি এই ক্ষণিকের সময়ে, কদাচিৎ কাউকে দেখেছি যে সময়ের সাথে সাথে তার প্রিয় মানুষদের প্রতি বা তাদের সম্পর্কের প্রতি তিক্ততা না আসতে।
আসলে এর পেছনের মূল কারণটা কি আপনি সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন? মানুষ একটি মানুষকে ভালোবাসে কখন বা একটি মানুষকে আপন করতে চায় কখন? হয়তো আপনার তার মধ্যে কোনো না কোনো একটি জিনিস ভালো লেগেছে আর তাকে আরও গভীরভাবে জানার প্রয়াসেই হয়তো সম্পর্ক অগ্রসর হয়। যেখানে আমাদের উদ্দেশ্যই থাকে আমাদের প্রিয় মানুষটাকে আরও গভীরভাবে জানা, সেখানে সময়ের সাথে সাথে ত ভালোবাসার গভীরতা আরও বাড়ার কথা যেহেতু আপনি তাকে আরও বেশি জানতেছেন, বুঝতেছেন, তাই নয় কি?
কিন্তু আমি পারপাশে খুবই সাধারণ একটি জিনিস পরিলক্ষিত করেছি আর তা হলো সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কে তিক্ততা চলে আসা, একঘেয়েমি একটা ভাব চলে আসা। মনে হয় যেন একসময় যে মানুষটা সবচেয়ে প্রিয় ছিলো তার থেকে দূরেই প্রশান্তি এখন। এবার শুরু হয়ে যায় দূরে যাওয়ার পালা, কোনো একটি কথাকে একজন কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে ব তা সেভাবে না নিয়ে বরংচ তার বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা করে, অভিমানের মাধ্যমে সে সম্পর্ক থেকে দূরে গিয়েই জীবনের আসল প্রাপ্তি এখানেই।
আসলে সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কে একঘেয়েমি বা তিক্ততা আসার মূল কারন বোধহয়, আপনি তার সব কিছুই জেনে ফেলছেন এবার আর নতুনত্ব কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না যে তার ভেতরে মায়া আপনাকে মুগ্ধ করবে বা সে মায়া আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। এইতো গতকাল আমার কাছের দুটি মানুষের মধ্যে একটি বিবাদ পরিলক্ষিত করলাম, আর তাদের দুজনই দুজনের খুবই আপন, কিন্তু দুজনই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এবং বিপরীত মানসিকতায় জিনিসগুলো চিন্তা করে বহু বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে, অভিমানে দূরে সরে যাচ্ছে আর বুঝি একে আপরের সাথে কথাই বলবে না।
আর আমার জীবনে সম্পর্ক জিনিসটি সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে, বোধহয় আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস এটিই পৃথিবীতে। আমি তাদেরকে তাদের সম্পর্কে সূচনার সময়গুলোর কথা একবার মনে করিয়ে দিলাম, সম্পর্কের উপসংহারে যাবার আগে, দেখলাম তারা তাদের নিজেদের অভিমানী সুর বাদ দিয়ে পুনরায় একত্র হলো, আর আমার মনে হয় আমার জীবনের প্রাপ্তিগুলো এখানেই।