আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা, দীর্ঘস্থায়ী কোনো কিছুতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে না যার একটা বড় কারন হলো দীর্ঘস্থায়ী সব জিনিসের মধ্যেই কিছুটা একঘেয়েমি ভাব চলে আসে। জিনিসটা যতই রোমাঞ্চকর হোক না কেন, সময় যত অগ্রসর হতে থাকে রোমাঞ্চের রঙ ধীরে ধীরে বর্ণিলের দিকে যেতে থাকে এবং এক সময় গিয়ে রঙ পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়। আর সে জন্যই ক্ষণিকের প্রশান্তিতে মানুষ ডুবে থাকতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে, যদিও সেখানে উপভোগের সময় তেমন দীর্ঘ হয় না, তবুও যতটুকুই থাকে তা রোমাঞ্চের রঙ দিয়ে পরিপূর্ণ থাকে এবং একজন সেথায় স্বর্গীয় সুখ অনুভব করতে বাধ্য।
এখনকার সময়টা একটু অন্য রকম, কারন আর কয়েকদিন পরই ঈদ। চারদিকে উৎসবমূখর একটা সময় বিরাজ করবে আর কিছুদিন পরই। যখন ছোট ছিলাম তখন এসময়টাতেই শহর থেকে গ্রামে পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য আমার অন্তরে এক অন্য ধরনের অধীরতা কাজ করত। কখন এই সময়টা ফুরাবে, কখন বাড়ি যাব, সে অংকগুলো একা একাই কষতে থাকতাম মনের অন্তরালে। এসময়টাতে স্কুল বন্ধ দিয়ে দিত, আর সময়ও যেন যেতে চাইত না। আমার প্রতিক্ষার প্রহরগুলোও ভীষণ দীর্ঘ হয়ে যেত।
আমার আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু ছিল গ্রামকে ঘিরে। গ্রামে যাব, সবার সাথে একসাথে দেখা হবে, জমিয়ে আড্ডা হবে আর গরু নিয়ে ব্যস্ততা ত একধরনের লেগেই থাকত। পুকুরপাড় গিয়ে গরুর জন্য নিজ হাতে কিছু দূর্বাঘাস নিয়ে এসে, খেতে দেয়ার মাঝেই ছিল অন্যরকম এক ক্ষণিকের প্রশান্তি। তখন বাবা-মাও আমার এসব কর্মকান্ডে দেখে আমাকে বাধা দিতেন না, আমি স্বাধীন হয়ে যেতাম। আর এই ক্ষণিকের স্বাধীনতার মাঝে এক অন্য ধরনের প্রশান্তি কাজ করত।
ছোট ফুপির ভীষণ আদরের ছিলাম আমি। গল্প শুনতে ভারী পছন্দ আমার সেই তখন থেকেই আর রাত যত গভীর হত, রাতে খাবার শেষে উনি আমাদের সবার সাথে বসে গল্পের আসর জমাতেন। সে গল্পের মধ্যে ছিল বাবার করা কিছু সাহসী কর্মকান্ড, তাদের সময়কার সমাজের অবস্থা, গ্রামে কিছু ভয়ানক স্থানের নাম এবং সেখানে ঘটে যাওয়া কিছু আশ্চর্যকর ঘটনার বর্ণনা করতেন খুবই সাবলিল ভাষায়।
আর রাত বেশি গভীর হয়ে পরলে তখন পাশের ঘরেই দাদার সাথে থেকে যেতাম। আর ভোর সকাল হতে না হতেই তিনি আমায় নিয়ে গ্রামের বাজারে যেতেন। যেহেতু সবসময়ই উনি সকাল সকাল গ্রামের বাজারে যান একা একাই, আমি যাওয়াতে উনার একজন ভালো সঙ্গি হয়েছে বুঝা যাচ্ছিল। গ্রামের রাস্তা ধরে আমরা দুজন বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে বলতে হেঁটে হেঁটে বাজারের দিকে যেতে থাকতাম। যদিও বাড়ি থেকে বাজারের দূরত্ব বেশ ভালোই ছিল, কিন্তু গল্প করতে করতে আসার কারনে সে দুরত্ব তেমন একটা টের পেতাম না তখন। সেখানে চায়ের দোকানে দ্বিব্বি আড্ডা দিয়ে যেতেন তিনি, তার সমবয়সী লোকদের সাথে বসে। আর আমায় অতি গর্বের সাথে পরিচয় করে দিতেন। আর এখানেও ভীষণ ক্ষণিকের প্রশান্তি মিলত আমার।
ঠিক এভাবে করতে করতে যখন ঈদের ছুটি শেষ হয়ে যেত তখন আবার নিজ ঘরে ফেরার পালা। ঈদের পর বেশি হলে দুই থেকে তিন দিন এর বেশি কখনো থাকা হয়ে উঠে নি আমার গ্রামে। পুনরায় আগের জায়গায় ফিরে যেতে আমি কিছুতেই চাইতাম না। ভীষণ কান্নাকাটি করতাম ফেরার পথে প্রিয় মানুষদের ছেড়ে, আমার স্বাধীনতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি বলে। অবশ্য এখানে কারোরই কিছু করার নেই, নিজ নীড়ে সবারই যেতে হবেই সময় ফুড়িয়ে গেলে। আমরা শুধু ক্ষণিকের প্রশান্তি উপভোগ করতে এসেছি।