এই সেই দিন, যে দিনটির জন্য আমি বহু দিন, মাসের পর মাস, এমনকি এক বছরেরও অধিক অপেক্ষায় বসে ছিলাম আমার প্রিয় মানুষটির জন্য কিছু লিখব বলে। একদম আমার নিজের আঙ্গিকে, একদম আমার নিজের নিয়মে, আমার স্মৃতির ক্যানভাসে তার সাথে কাটানো আমার বর্ণীল সে দিনগুলোর রং দিয়ে রঙ্গিন করে, খুব সযত্নে বাধাই করে রাখব বলে এতো আয়োজন, এত প্রতিক্ষা আমার। বসেছিলাম গত বছর ঠিক এইসময়টাতেই, আমার সে স্মৃতির সাদা ক্যানভাসটা আমার তার সাথে কাটানো সে রঙিন সব মুহূর্তগুলোর সব রঙ একত্র করে নিজের মতো ক্যানভাসটা রঙিন করে বাধাই করব বলে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা আর হয়ে উঠে নি। সেবারের মতো একবারেও আমি সেই একই ভুল পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছিলাম।
সেবার শেষ মুহুর্তে লিখতে বসে ভাবলাম, এবার ত সময় চলেই গেল পরেরবার নয়তো ধীরে সুস্থে ক্যানভাসটা রঙিন করব। কিন্তু এবারও ঠিক একই ভাবনা আমার মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশে এসে কড়া নাড়ছে। আমি ভাবলাম আমি যদি এবারও ক্যানভাসটা রঙহীন অবস্থায় রেখে দেই আর পরের বছরের অপেক্ষায় রয়ে যাই, আর এই পরের বছর যদি আমার কাছে আর না আসে তাহলে ত আমার ক্যানভাসটি আর রঙিনই হবে না। এভেবে তড়িঘড়ি করে এখুনি লেগে পরলাম সাদা ক্যানভাসটি রঙিন করার কাজে।
শুরু থেকেই শুরু করা যাক তবে, মানুষ বলে মেয়েরা নাকি তার বাবার খুবই আদরের হয়, আর ছেলেরা নাকি তার মার জানি না কথাটা কতটুকু সত্য তবে, আমি আমার দিক থেকে বলতে পারি আমরা দুই পিঠাপিঠি ভাই-বোনকে মার একার পক্ষে সামলাতে অনেকটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল, আর ছোটকালে আমি নাকি একটু দুষ্টু স্বভাবের ছিলাম আর সেজন্য প্রায়ই মার বকুনি খেতে হতো, সারাদিন অপেক্ষার পর যখন সন্ধ্যায় তিনি অফিস সেরে ইউনিফর্ম পড়ারত অবস্থায় আমাদের দুই ভাইবোনের জন্য দুটো টিপসের প্যাকেট হাতে হাসিমুখে দু'হাতে আমাদের দুইজনকে একসাথে কোলে নিতেন, সেসময় আমি যেন রাজা হয়ে যেতাম। গলগল করে সারাদিনের নালিশ উনাকে দিতাম আর উনি অভিনয় ভঙ্গিতে মাকে বকা দিতেন।
সবাই মনে করে যে তাদের বাবারা তাদের কাছে হিরো, সবার বাবার কথা আমি সঠিক বলতে পারব না, কিন্তু আমি আমার বাবার কথা সত্যই বলতে পারব উনি আসলেই হিরো আমার কাছে, আমি আমার জন্মের পর থেকে আমার বাবাকে হারতে দেখি নি, উনি বহু কাজে পারদর্শী, একবার যা দেখেন তা উনি সহজেই আয়ত্ত্ব করে নিতে পারেন আর আমি বলতেই পারি এটা উনার অন্যতম বিশেষ একটি গুণের মধ্যে পড়ে। আমি এখনো মনে করতে পারি সেবার আমার বয়স তখন পাঁচ এর বেশি হবে না, তখন যশোর কোয়াটারে ছিলাম আমরা। একদিন কারেন্টের মেইন সার্কিট থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে, পুরো কোয়াটার রাতে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, এদিকে রাতে বাবা অফিস শেষে ফিরে একাই মেইন লাইনে বিদ্যুৎ সংযোগ কয়েক মিনিটের মধ্যে ঠিক করে পুরো কোয়াটারে রাতে বিদ্যুৎ পুনরায় ফিরে আসে।
সেবার এক প্রতিযোগিতায় বাবা প্রথম হতে পারে নি, সেজন্য আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমার সমবয়সী একজন ছেলে আমাকে এসে সান্তনা দিচ্ছিলো এ বলে যে তার বাবাও ত জয়ী হয় নি। আমি রেগে মেগে তাকে উত্তর দিলাম, "আমার বাবা অন্য সবার মতো না।" এবলে আমি কেঁদেই ফেলি। কারন আমি মানতাম আমার বাবা সুপার হিরো৷ অবশেষে এ অবস্থা লক্ষ্য করে, বাবা আমায় কাছে টেনে নিয়ে বলল, "ধুরু বোকা, খেলায় ত হার জিত থাকবেই, এজন্য কাঁদতে হবে নাকি?!" আমি বললাম, "না, তুমি হারতে পারো না, এবলে পুনরায় ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাম।" বাবা আমায় জড়িয়ে ধরে, হাসতে লাগল।
শৈশবের কম বেশ প্রায় সব শখই উনি আমার পূরণ করেছেন। আমার শখ ছিল ভারী সে বন্দুক আমি দুহাতে ধরব। অবশেষে একদিন বাবা বন্দুক হাতে সব গিয়ার সহ যাচ্ছিলো ফোর্সের সাথে তখন ক্ষণিকের জন্য উনার থেকে চেয়ে বন্দুক ধরার সৌভাগ্য হয় আমার সেই ছোট্ট বয়সে আমার, যদিও বন্দুক ভীষণ ভারী ছিল তাই উনিই বেশিরভাগ ভর ধরে ছিলেন।
সিএমএইচ এ কোনো কারনে মা'র সাথে গেলে বাবা সাথে সাথে অফিস থেকে আসতো, আর ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে আমাকে আমার ইচ্ছে মতো সব কিনে দিতো এবং বলত বাসায় নিয়ে যেন আপুকে না বলি। আহা! কি রঙিন ছিলো সে দিনগুলো। এ স্মৃতিগুলো সবই ক্লাস থ্রি, ফোর কিংবা এর আগের স্মৃতি, ভীষণ সুখকর ছিল দেখে এখনো মনে আছে হয়তো আজীবন স্মৃতির পাতায় অম্লায় হয়ে থাকবে। যদি ভুলেও যাই, তাই স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য এটা লিখে রাখলাম।
যদিও বড় হবার সাথে সাথে আগের মতো বাবা আর এত মিশতে পারে না, প্রাণ খুলে কিছু একটা আগের মতো বলে না। কেমন জানি অনেকটা চুপচাপ হয়ে গেছে। মুখটাতেও আগের মতো সেই জ্বলজ্বল প্রদ্বীপের ন্যায় হাসির দেখা মিলে না। হয়তো অনেকটা ভাবুক প্রকৃতির হয়ে গেছেন উনি, মাঝে মাঝে আমি উনাকে নিয়ে ভাবি, "কি এত ভাবেন উনি?"