বাপের বাড়িতে থাকার বছরখানেক পর আকাশের মামারা এবং নানা তার মাকে আবার বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে থাকে। কিন্তু তার মা তাদেরকে বলে, " আমার একটাই ছেলে আকাশ, যেকিনা ছোটকালে তার বাবার স্নেহ পায় নি, আর আমার যদি বিয়ে হয়ে যায় তাহলে সে তার মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা থেকে বন্ধিত হবে, যা কিনা সৃষ্টিকর্তাও মেনে নিবে না। তাই আমি পণ করেছি যে আমি আর বিয়ে করব না, আমি আমার ছেলের মুখের দিকে চেয়ে আমার বাকি জীবন পার করে দিতে চাই। এখানে থাকাতে যদি তোমাদের কোনো সমস্যা হয় তাহলে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাব। "
তখন আকাশের নানা তার মাকে বলল, " আরে, নাহ্ এটা ত তরও বাড়ি। তুই এখানে আমার নাতিকে নিয়ে আজীবন থাকবি কেউ তকে আর বিয়ে নিয়ে কিছু বলবে না। "
আকাশ ছোটকাল থেকেই খুবই চঞ্চল, অগোছালো এবং বেখেয়ালি স্বভাবের ছিল। দিনকে দিন যেতই বড় হতে থাকে, তার স্বভাবগুলো ততই তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। সে যখন বিকেলে খেলাধুলা করে সন্ধ্যায় প্রায় সময়ই কাদামাখা শরীরে বাড়ি ফিরত, কখনোবা বালু মাখা অবস্থায় বাড়ি ফিরত, এমনকি ঘরের তার পড়া শেষে তার বইগুলোও সে গুছিয়ে রাখত না। তার এই স্বভাবগুলোর জন্য তাকে কেউই ভালো চোখে দেখত না। কিন্তু তার মা কখনো কোনো জিনিস নিয়ে তাকে বকাঝকা করত না। কারন আকাশকে যদি কিছু বলে তাহলে তাকে সান্তনা দেয়ার কেউ থাকবে না। কিন্তু তিনি প্রতিরাতে তার ছেলেকে নিয়ে ঘুমানোর সময় তার ছেলেকে প্রায় এসব বিষয় বুঝানোর চেষ্টা করতেন। ঈদের ছুটিতে তার মামাতো ভাইয়েরা শহর থেকে গ্রামে ঈদ করতে আসলে তার মা, তাকে তাদের সাথে তুলনা দিয়ে বলতেন, " দেখো, তারা কত গোছানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। দিন দিন ত বড় হচ্ছো, নিজের কাজ নিজে করতে শেখো, এখন ত আমি আছি তাই কোনো কিছু বুঝতে পারছ না, আমি না থাকলে সব বুঝতে পারবে। "
আকাশ তার মাকে বলল, " তুমি আবার কোথায় চলে যাবে? "
প্রতিউত্তরে তার মা বলল, " আরে বোকা, আমি কি সারাজীবন বেচে থাকব নাকি? আমি মারা গেলে তখন কি করবি? "
তখন আকাশ বলল, " তুমি আমার আগে মরতেই পার না।"
আকাশ উন্মুক্তভাবে চুটে চলতে চাইত, সে চাইত তাকে যেন কোনো কাজে বাধা দেয়ার মতো কেউ না থাকে। সে এমন এক জীবন কল্পনা করত যদি তার যখন যা ইচ্ছা, তাই করতে পারত, কেউ তাকে কিছু বলত না, তাহলে কতই না ভালো হতো। সে একা একা বিলের নদীর পানিতে মাছ ধরত৷ বৃষ্টিতে কাদামাখামাখি করে ফুটবল খেলত, বালু নিয়ে বিলের পানিতে ঘর বানাত, তাকে
যদি কেউ কিছু না বলত, কতই না মজা হত! সে প্রায় এসব চিন্তা করত।
একদিন সে ক্লাস তৃতীয় শ্রেণিতে উঠার পর স্কুল থেকে বইয়ের লিস্ট দেয়৷ সে বাড়ি ফিরে সেই বইয়ের লিস্টটি তার মায়ের কাছে দিয়ে বলে, " স্কুল থেকে স্যার এই বইয়ের লিস্টটি দিয়েছে এবং এই বইগুলো কিনে আনতে বলছে। " তার মা বলল, " আগামীকাল শহর থেকে গিয়ে বইগুলো কিনে আনব। "
আগামীকাল তার মা শহরে যায় বইগুলো কিনার জন্য, বই কিনে বাসে করে ফেরার পথে যে বাসে করে তার মা আসছিল সে বাসটির একটি ট্রাকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় এবং এ দূর্ঘটনায় তার মা প্রাণ হারায়।
এরপর থেকে হঠাৎ আকাশের জীবনে আমুল পরিবর্তন চলে আসে, তাকে শাসন বারণের কেউ থাকে না। সে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে চলতে পারে, তাকে কেউ কিছু বলে না, সে এতদিন যে উন্মুক্ত জীবনের প্রত্যাশা করত, তা তার কাছে আর ভালো লাগে না। সেই চন্ধল, বেখেয়ালি আকাশ খুবই শান্ত এবং গোছানো হয়ে গেল।