আজ থেকে প্রায় বহু বছর পূর্বের কথা, যখন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মানুষ চিঠি লিখত। তখন মুঠোফোন নিয়ে কেউ কখনো কল্পনাও করে নি। সেসময় সানজিদা নামের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ে, সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের তার পরিবারের সাথে খুলনা শহরে বসবাস করত। তারা তিন বোন ও চার ভাই ছিল। ভাই-বোনদের মধ্যে সানজিদাই সবার বড়। তার বাবা খুবই অল্প বেতনের একটি চাকরি করত যা দিয়ে তাদের পরিবারকে অনেক কষ্ট করে দিন অতিবাহিত করতে হত। সানজিদার পরিবার যে বাসায় ভাড়া থাকত সে বাসার মালিক অনেক ভালো মানুষ ছিল। সে মালিকের ছিল তিন মেয়ে বড় মেয়ের নাম লিমা, মেজো মেয়ের নাম নিলা আর ছোট মেয়েটার নাম ছিল অর্পা। তারা তিন বোনই অনেক ভালো, মিশুক ও উদার মনের ছিল। যে কারো সাথে তারা সহজেই অল্প সময়ে মিশে যেতে পারত। অর্পা আর সানজিদা সমবয়সী ছিল। সানজিদার পরিবার যখন প্রথম অর্পাদের বাসায় ভাড়া আসে এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অর্পাসহ অর্পার বাকি বোন লিমা ও নিলার সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। অর্পাসহ, তার বাকি দুইবোন সানজিদাকে খুবই ভালোবাসত।
সানজিদার পরিবার নিম্ন মধ্যবিত্ত হওয়ায় বিভিন্ন সময় স্কুলের বই কিনতে তাকে অনেক বেগ পেতে হত। তার বিভিন্ন ধরনের গল্পের বই পড়ার অনেক শখ ছিল। অর্পাদের বাসায় তার বোনরা অনেক গল্পের বই পড়ত তাই তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের গল্পের বই কিনে রাখত। সে গল্পের বই থেকে সানজিদাকে তারা পড়তে দিত।যতদিন যেতে থাকে সানজিদা আর অর্পার বন্ধুত্বের গভীরতা বাড়তেই থাকে। সানজিদা স্কুলের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা অর্পার সাথে শেয়ার করত। অর্পাও তার নিত্যদিনের ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা সানজিদার সাথে শেয়ার করত। অর্পা ঘরে যেদিন ভালো কিছু রান্না করা হতো সেদিন অর্পা সানজিদার জন্য তার নিজের অংশ থেকে অর্ধেক অংশ সানজিদার জন্য রেখে দিত। পরে দুজনে একসাথে তা খেতো।
এভাবে তাদের দিনগুলো ভালো কাটতে থাকে, সানজিদা যখন দশম শ্রেণিতে পড়ত তখন একদিন সে স্কুল থেকে বাসায় আসার পর দেখল তার মার জন্য গ্রাম থেকে একটি চিঠি এসেছে। তার মাকে তাকে বলল চিঠিটি খুলে পড়া শুরু করতে। সে তার মার কথা মতে চিঠিটি খুলে পড়া শুরু করল। চিঠিতে সানজিদার নানু মারা যাওয়ার সংবাদ লেখা ছিল। এখবর শোনার পর সানজিদার মা ভেঙে পড়ল এবং গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য বেকুল হয়ে পড়ল। কিন্তু এদিকে কিছু দিনের মধ্যে সানজিদার মাধ্যমিক পরিক্ষা শুরু, হতে যাচ্ছে। তাই সে তার বাবার সাথে খুলনাতেই থেকে গেল, আর ওইদিকে তার মা তার ছোট ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেল। তার মা নাকি আর খুলনাতে আসবে না গ্রামেই থাকবে। তারপর সানজিদা তার বাবার সাথে থেকে তার মাধ্যমিক পরিক্ষা দেয়। পরিক্ষা শেষ হওয়ার পর তার বাবা তাকে গ্রামে বাড়ি দিয়ে আসতে যাবে ঠিক সে সময় সানজিদা তার বান্ধবী অর্পার সাথে শেষ দেখা করতে যায়, তখন অর্পা ও সানজিদা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে এবং যাওয়ার পথে সানজিদাকে কাগজে একটা একটি চিঠি এবং পাউডার একটি কাগজে মুড়িয়ে দেয় (এটি কিছুটা হাস্যকর মনে হতে পারে আপনাদের কাছে)।
বাসে উঠে সে সারারাস্তা সে কাঁদতে কাঁদতে থাকে এবং তা দেখে বাসের কন্টেকডার পর্যন্ত অবাক হয়ে যায়। গ্রামের বাড়ি গিয়ে সানজিদার যখনই তার বান্ধবীর কথা মনে হত সে পুকুর পাড়ে গিয়ে একা একা বসে কান্না করত।
আজ প্রায় ত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে সে খুলনা থেকে আসার পর, কিন্তু আজ সে স্মৃতিগুলো ভুলতে পারে নাই। সেই চিঠি এখনো সে সযত্নে রেখে দিয়েছে। হয়ত কখনো একবার সেখানে গিয়ে তাদের দেখা পাবে এ আশায়!