চাকরি থেকে অবসরে আসার পর উনি তার নিজ গ্রামের বাড়িতে তার স্ত্রীকে নিয়ে ভালোই সময় কাটতেছিল। তার চার ছেলের প্রত্যেকেই দেশের বাইরে থাকে। প্রতি মাসে উনি পেনশনের কিছু টাকা পান এবং মাঝে মাঝে উনার ছেলেরা বিদেশ থেকে টাকা পাঠায়, তা দিয়ে তাদের সময় ভালোই চলতে থাকে।
এভাবে বছর পাঁচেক যাওয়ার পর কয়েকদিন যাবৎ তার শরীরের অবস্থা ভালো যাচ্ছিল না। একদিন রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ বিছানা থেকে মাটিতে পরে যায় রমিজ মিয়া, সকালে তার স্ত্রীর ঘুম ভাঙতেই তার স্বামীকে নিচে অজ্ঞান হয়ে পরে থাকতে দেখে সে কান্নাকাটি শুরু করল। তার কান্নার আওয়াজ শুনে পাশের বাড়ি থেকে লোকজন এসে উনাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার পরিক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখল যে রমিজ মিয়া ব্রেই স্টোক করেছে এবং তার ডান পা পুরোপুরি প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। স্ত্রী এ খবর শুনার পর মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পরল। এক মাস হসপিটালে ভর্তি থাকার পর ডাক্তার তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
বাড়িতে এসে সারাদিন সে তার ঘরের বিছানায় শুয়ে থাকত এবং বিকাল হলে হাতলে ভর করে বারিন্দায় গিয়ে চৌকিতে বসে থাকত। এই অসুস্থ অবস্থায় তার একাকিত্ব ভাবটা বাড়তে থাকে এবং মনের মধ্যে বিভিন্ন উদ্ভট চিন্তা-ভাবনা আসতে থাকে। এদিকে সে তার ছেলেদের অনেক মিস করতেছে। প্রায় দশ বছর হয়ে যাবে ওরা যেদেশে আসে না। তারপর উনি উনার স্ত্রীকে একথা বলার পর, উনার স্ত্রী একদিন ফোন করে ছেলেদের বললেনঃ তর বাবা ত অসুস্থ! তোর বাবার নাকি তদের দেখতে অনেক ইচ্ছে করছে, সময় করে একবার দেশে এসে দেখে যাস না বাবা! তারা সবাই বললঃ আচ্ছা, আসব।
কিন্তু কেউই তার অসুস্থ বাবাকে দেখতে এলো না। এভাবে একাকিত্বে তার জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। একদিন বিকালে রমিজ সাহেব বারিন্দায় বসা ছিল। হঠাৎ মধ্যবয়সী একজন লোক তার ঘরের উঠানে এসে 'স্যার' বলে ডাক দিল, তার হাতে ছিল ফলের কিছু ব্যাগ এবং কাছে এসে উনার পায়ে ধরে সালাম করল। রমিজ সাহেব বললঃ বাবা, তোমাকে ত সঠিক চিনে উঠতে পারলাম না!
প্রতি উত্তরে লোকটি বললঃ স্যার, আমি আপনের স্কুলের ছাত্র তপন। আমি আমেরিকায় থাকি। এক সাপ্তাহ হলো দেশে এসেছি, তাই আপনাকে দেখতে এসেছি।
এ কথা শুনার পর রমিজ মিয়া তার ছাত্র তপনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। অসুস্থ অবস্থায় তাকে তার নিজ সন্তানই দেখতে আসল না, আর সে জায়গায় তার ছাত্র তাকে দেখতে এসেছে। অসহায় অবস্থায় যে এটাই সবচেয়ে বেশি পাওয়া। যাওয়ার সময় তপন তার শিক্ষককের হাতে দশ হাজার টাকা দিয়ে বললঃ স্যার, এটা রাখেন। আর আমার ফোন নাম্বারটা রাখেন যেকোনো সময় যেকোনো দরকার লাগলে ফোন দিয়েন। আজ আসি।
অসুস্থ অবস্থায় মানুষ অনেক অসহায় হয়ে পরে। তার কাছে করার মতো কিছু থাকে না। এ সময় মনের মধ্যে নানা-প্রকার দুশ্চিন্তা এসে ভর করে। তাই আমাদের সবার উচিত আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়ে পরলে তাদের দেখতে যাওয়া, এতে তারা মন থেকে অনেক বেশি খুশি হয়।