প্রায় ১ হাজার বছর আগের কথা। অতীশ দীপঙ্করের নাম ডাক তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্ব তিব্বতের এক রাজা অতীশ দীপঙ্করকে নিজেদের রাজ্যে দিয়ে যাবার জন্য অনেক উপহার দিয়ে বাংলাদেশে দূত পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু অতীশ দীপঙ্কর সে আমন্ত্রন প্রত্যাখ্যান করেন।
Image Source Wikipedia
বাংলাদেশের মানুষদের মাঝে সর্বপ্রথম যে নাম আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, তা হল অতীশ দীপঙ্কর। ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকার বিক্রমপুরের এক রাজপরিবারে জন্মগ্রহন করেছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি সংসার ধর্ম ত্যাগ করে জ্ঞান অন্বেষণের জন্য বেড়িয়ে পড়েছিলেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সেখানকার গুরুদের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহন করে বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান আহরন করা শুরু করেছিলেন তিনি। এভাবে নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে তিনি ব্যাপক পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।
এভাবে দীর্ঘদিন নানা বিষয়ে জ্ঞান লাভের পর ৪৩ বছর বয়সে তিনি মগধে ফিরে আসেন। মগদের তখনকার পন্ডিতদের সাথে তার নানা বিষয়ে তর্ক বিতর্ক হতো। তিনি তার অগাদ পান্ডিত্য দিয়ে যে কাউকেই তর্কে হারিয়ে দিতে পারতেন। ফলে তখন খুব অল্প সময়েই তার পরিচিতি দ্রুত পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এসময় তিনি বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারের আচার্য্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এসময়েই সেই মজার ঘটনাটি ঘটে। পশ্চিম তিব্বতের এক প্রাচীন রাজ্য আছে, যার নাম গুজ। সে রাজ্যের রাজা তার নিজের রাজ্যে শিক্ষার বিস্তৃতি ঘটানোর জন্য অতীশ দীপঙ্করকে আমন্ত্রন জানান। কিন্তু অতীশ দীপঙ্কর প্রথমে নিজ দেশ ছেড়ে এত দূর যাবার পক্ষে সায় দেন নি। তাই সে আমন্ত্রন প্রত্যখান করেছিলেন।
তার কয়েক বছর পর গুজের পাশের দেশের শাসকের হাতে বন্দি হোন গুজের রাজা। তারা মুক্তিপণ হিসেবে প্রচুর সোনা ও অর্থ দাবী করে। তখন গুজের রাজা তার পরিবারকে বলেছিলেন এত অর্থ দিয়ে তাকে মুক্ত না করে বরং সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে যেন অতীশ দীপঙ্করকে তিব্বতে নিয়ে আসা হয়।
গুজের রাজার মৃত্যুর পর তার পুত্র সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসেই তিনি তার পিতার শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে অতীশকে পত্র লিখেন। এবার আর তিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। শুভ দিন দেখে যাত্রা শুরু করলেন তিব্বতের উদ্দেশ্যে।
তিব্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রাটা অতীশ দীপঙ্করের জন্য অন্যরকম ছিল। যাত্রাপথে প্রতিটা দেশ, প্রতিটা রাজ্যের রাজারা তাকে বিশেষ ভাবে সম্মাননা জানিয়েছিলেন।
অবশেষে যখন তিব্বতে পৌছেন, তখন দেখেন যে সেখানকার রাজা তার সম্মানে বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করে রেখেছে। সেই দৃশ্যটি এখনোও সেখানকার এক মঠে আঁকা রয়েছে। যায় হোক, অতীশ দীপঙ্করকে স্বাগত জানানোর জন্য সেসময় রাগদুন নামের একদম নতুন একটি বাদ্যযন্ত্রও তৈরি করা হয়েছিল। অতীশ দীপঙ্করের জ্ঞান, প্রজ্ঞার জন্য তাকে তীব্বতের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরুর পদে বসানো হলো। বর্তমান লামারা আমাদের সেই হাজার বছর আগের সেই অতীশ দীপঙ্করেরই উত্তরসূরী।
জীবনের বাকি সময়টা অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতেই কাটিয়েছিলেন। নিজের সারাজীবনের অর্জিত জ্ঞান তিনি এখানের ছাত্রদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি সে সময় তিনি অনেক বইও লিখেছিলেন, যেগুলো এখন পৃথিবীর বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠয় বই হিসেবে পড়ানো হয়।
সুদীর্ঘ ১৩ বছর তিববতে অবস্থানের পর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৭৩ বছর বয়সে তিববতের লাসা নগরের নিকটস্থ লেথান পল্লীতে ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে দেহত্যাগ করেন। তাঁর সমাধিস্থল লেথান তিববতিদের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৮ সালের ২৮ জুন দীপঙ্করের পবিত্র চিতাভস্ম চীন থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকায় আনা হয় এবং তা বর্তমানে ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে সংরক্ষিত আছে।