আলেকজেন্ডার দ্যা গ্রেট... পুরো পৃথিবী জয়ের নেশা যার মাথায় চেপেছিল। একের পর এক দেশ জয় করতে করতে এসে পৌছলেন ভারতে। ভারতেও নিজের শক্তি ও বুদ্ধিমত্তায় একের পর এক রাজ্য দখল করতে করতে এক সন্ধ্যায় পাঞ্জাবের বিপাশা নদীর তীরে এসে শিবির বানালেন। এক দিন শিবিরে খবর আসলো পূর্বে প্রাসিয়াই বলে এক দেশ আছে, আর সেই দেশের পূর্বে গঙ্গারিডি নামে আরো একটা দেশ আছে। গঙ্গারিডির রণহস্তির জন্য কোনো রাজা সেই দেশ জয় করতে পারেন নি। গঙ্গারিডির রাজা নাকি তার সেই বিশাল রণহস্তি বাহিনী নিয়ে আলেকজেন্ডারের মুখোমুখী হবার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছে।
তা শুনে আলেকজেন্ডারের গঙ্গারিডির জয়ের নেশা বেড়ে গেল। কিন্তু দীর্ঘদিন টানা যুদ্ধে থেকে ক্লান্ত থাকা সৈন্যদের কোনো ভাবেই আর মানাতে পারছিলেন না। পাশাপাশি এই অবস্থায় গঙ্গারিডাইদের মুখোমুখী হলে পরিস্থিতি হতো ভয়াবহ। তাই সবকিছু বিবেচনা করে আলেকজেন্ডার পিছু হঁটতে বাধ্য হয়েছিলেন।
প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদদের লেখায় গঙ্গারিডির নাম খুব ভালভাবেই পাওয়া যায়। ভারতের গঙ্গার আশেপাশের অঞ্চলসমূহ, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ নিয়ে এই রাজ্যের অবস্থান ছিল। গঙ্গা নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল বলে এর নাম ছিল গঙ্গাঋদ্ধি, গ্রিকদের কাছে গঙ্গারিডি হিসেবে পরিচিত। ডিউডোরাস, টলেমি, প্লুটার্ক, ভার্জিল, প্লিনিদের মতো গ্রিক কিংবা রোমান লেখকদের বর্ণনায় গঙ্গাঋদ্ধির কথা পাওয়া যায়। শুধু তা নয়, তাদের বর্ণনায় প্রাপ্ত তথ্য এ বিষয়ে ইঙ্গিত দেয় যে, পাশ্চাত্যের দূরবর্তী দেশগুলো পরবর্তী ৫০০ বছর গঙ্গারিডাইদের নাম ও যশ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল।
এই অঞ্চলে আমাদের বাংলা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল। যুগে যুগে এই বাংলা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীদের স্বারা শাসিত হয়েছে। মৌর্য-গুপ্ত থেকে শুরু করে কখনো পাল, সেন কিংবা মোঘল শাসন হয়ে সর্বশেষে ব্রিটিশ কর্তৃক শাসনের ইতিহাস রয়েছে এখানে। দিল্লী সালতানাত এবং শাহী বাংলার সুলতানদের সময় ইউরোপবাসীদের কাছে বাংলা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী বাণিজ্যিক দেশ হিসেবে পরিচিত হলো। এরপর যখন মুঘলদের অধীনে আসে, তখন আমাদের বাংলা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী প্রদেশ।
প্রাচীন ইতিহাসে বাংলা যতই সম্পদশালী হোক না কেন, কেমন ছিল এখানকার মানুষের জীবন ব্যাবস্থা? কেমন ছিল গঙ্গারিডি থেকে আজকের বাংলাদেশ হবার পথটুকু? নিশ্চয় খুব সহজ ছিল না। আমরা আমাদের আলোচনায় এই বিষয়েই আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
২.
এই অঞ্চলে ঠিক কবে থেকে মানুষের বসতি স্থাপিত হওয়া শুরু হয়েছে, সে সম্পর্কে সঠিক ভাবে বলা সম্ভব না। তবে মুসলিম পৌরাণিক মতে মহাপ্লাবনের পর নূহ (আঃ) বংশীয় বঙ্গ নামের এক সন্তান তার পরিবার পরিজন নিয়ে এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন। অন্যদিকে ব্রাহ্ম ধর্মশাস্ত্রমতে বলিরাজের মহিষী সুদেষ্ণার গর্ভে অন্ধমুনি দীর্ঘতমার ঔরসে নাকি পাঁচটি ক্ষেত্রজ সন্তানের জন্ম হয়। তারা হল অঙ্গ, বঙ্গ, পুন্ড্র, কলিঙ্গ ও সুহ্ম। এ তো গেলো পৌরাণিক কাহিনী। এর বাইরেও আরো অনেক গল্প পাওয়া যায়, তবে বঙ্গ শব্দটা যে ঠিক কোন জায়গা থেকে এসেছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা সম্ভব না। বাংলা বা বেঙ্গল শব্দগুলির আদি উৎস অজ্ঞাত, কিন্তু বিশ্বাস করা হয় যে শব্দটি বং অথবা বাং নামক একটি দ্রাবিড়ীয়-ভাষী উপজাতি বা গোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বং জাতিগোষ্ঠী ১০০০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন।
এই বং বা বাং থেকেই পরবর্তীতে বঙ্গ, বাংগালা, বাঞ্জালা, বেঙ্গলা, বাংলা থেকে শেষ পর্যন্ত বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়েছে। ইউরোপিয়দের বেঙ্গলা/বেঙ্গল, আরব-তুর্কি-মোঘলদের বানজালা/বাঙ্গালা, চীনাদের মানচালা ইতিহাস ভূগোলে বহুদিন থেকে পরিচিত। আমাদের দেশের নামের দক্ষিণে যে সাগরটা রয়েছে, তার উত্তরে যে ভূখন্ডটি হিমালয়ের কোল পর্যন্ত পৌছেছে, ১৯৪৭ সালের পূর্বে সাধারণ ভাবে তাকেই বাংলাদেশ বলা হতো।
এ তো গেল নামের উৎপত্তির ইতিহাস। এবার এখানকার জনগোষ্ঠীর ইতিহাস সম্পর্কে কিছু জানা যাক। একটু আগেই বললাম যে ধারনা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১ হাজার সালের দিকে এই অঞ্চলে বং জাতিগোষ্ঠী বসবাস করা শুরু করেছিল। অবশ্য তার আগেও এখানে অনেক জাতিই বসবাস করেছিল। যেমন, বাংলাদেশের কুমিল্লা, বগুড়া ও জয়পুরহাটে প্লাইসটোসিন যুগের মানব বসতির সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। প্লাইস্টোসিন প্রায় চব্বিশ লক্ষ বছর আগের এক ভূতাত্ত্বিক, আবহাওয়া নির্ভর যুগ। বিবর্তন মতবাদ অনুসারে প্লায়োসিন-প্লেইস্টোসিন যুগ থেকেই মানব জাতির উদ্ভব। তবে সেসবের সাথে আমাদের বঙ্গ বা বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই।
ইতিহাস বিবেচনায় প্রাচীন বাংলা থেকে আধুনিক বাংলা পর্যন্ত এই অঞ্চলের ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন প্রাচীন বাংলা বা বৈদিক যুগ, ধ্রুপদী বাংলা, মধ্যযুগীয় বাংলা ও সবশেষে আধুনিক বাংলা।
প্রাচীন বাংলা বা বৈদিক যুগ হল এই অঞ্চলের জনবসতির সবচেয়ে প্রাচীন ইতিহাস। সনাতন ধর্মীয় বেদবর্ণিত সময়কালকে বৈদিক যুগ ব'লে চিহ্নিত করা হয়। সাধারণভাবে খ্রীস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রীস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ পর্যন্ত প্রায় ১০০০ বছরকে আমরা বৈদিক যুগ বলে থাকি। প্রাচীন বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। বিভিন্ন লিপিমাল ও তাম্রশাসনের বিবরণ হতে যতটুকু জানা যায়, তা অনেকটা অনুমান নির্ভর। সুহ্ম, পুন্ড্র, বঙ্গ, গৌড় প্রভৃতি জাতি ও ছোট ছোট রাজ্যের উল্লেখ আছে প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে। এসব থেকে অনুমান করা যায় যে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলগুলোর মতো বাংলাদেশেও প্রথমে কয়েকটি বিশিষ্ট জাতি সংঘবদ্ধভাবে বাস করতো এবং কালক্রমে তাদের মাঝে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গঙ্গারিডই নামে একটি শক্তিশালী রাজতন্ত্রের সাথে পরিচিত হয়েছিল। মহাভারতের বর্ণনানুসারে বাংলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য ঐক্যবদ্ধভাবে বিদেশি আক্রমন প্রতিহত করতো। গঙ্গারিডি আক্রমন থেকে আলেকজেন্ডারের পিছু ফিরে যাওয়ার জন্য এটি অন্যতম একটি কারণ ছিল। তাছাড়া মৌর্য ও গুপ্তযুগের বেশ কিছু প্রস্তরলিপি ও তাম্রশাসন বগুড়ার মহাস্থানগড়সহ বেশ কিছু স্থানে পাওয়া গিয়েছিল। এ থেকে ধারনা করা হয় যে বাংলার উত্তর ও পশ্চিমাংশের অনেকটাই যথাক্রমে মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।
ধ্রুপদী বাংলায় শশাঙ্ক, পাল সাম্রাজ্য ও সেন সাম্রাজ্যের ইতিহাস উল্লেখযোগ্য। বাংলার ইতিহাসে শশাঙ্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিনি গৌড় রাজ্যকে স্বাধীন করে প্রথম এক সার্বভৌম বাঙালি রাজ্য স্থাপন করেন। শশাঙ্কের পর যথাক্রমে পাল ও সেনরা দীর্ঘদিন বাংলা শাসন করে। ইতিহাস অনুসারে এই দুই বংশের রাজত্বকাল পরবর্তী প্রায় চারশো বছর ধরে স্থায়ী ছিল। সেন বংশের শেষ রাজা ছিলেন লক্ষণ সেন। ১২০৪ সালে মাত্র ১৭ জন সৈন্য নিয়ে তুর্কি সেনা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি নদীয়ায় আক্রমন করলে পালিয়ে যান লক্ষণ শেষ। ফলে সেন সাম্রাজ্যের পতনের পাশাপাশি এই বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। বাংলার নিয়ন্ত্রন চলে যায় দিল্লীর হাতে।
দিল্লী থেকে বিভিন্ন নবাব নিয়োগের মাধ্যমে বাংলাকে শাসন করা হতো। কিন্তু এখানকার শাসকেরা ছিল উচ্চবিলাসী ও স্বাধীনচেতা। দিল্লী থেকে আলাদা ও স্বাধীন হবার জন্য সুযোগ পেলেই বারবার বিদ্রোহ করতো, কিন্তু সুবিধা করতে পারতো না।
তেমনই একজন ছিলেন ফকরা, যিনি ১৩৩৮ সালে সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ উপাধি নিয়ে নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা দিয়ে সোনারগাঁও এর সিংহাসনে আরোহন করেন। ফখরুদ্দিনের বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে দিল্লী তার বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনা করেন। যুদ্ধে ফখরুদ্দিন হেরে পালিয়ে গেলেও পরে আবার সোনারগাঁও দখল করেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি তার রাজত্ব বাড়ান। তার হাত ধরেই বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমল শুরু হয়, যা পরবর্তী প্রায় ২০০ বছর স্থায়ী ছিল। এই সময়ের মাঝেই মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলায় এসেছিলেন।
স্বাধীন সুলতানি শাসকদের পতনের পর বিভিন্ন বিদেশি শক্তি বাংলাকে গ্রাস করতে থাকে। তবে মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের সময় বাংলা মোঘল সাম্রাজ্যের অংশ হবার পর তা আবার দিল্লীর অধীনে চলে যায়। সেসময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিশালী অনেক স্বাধীন জমিদার রাজত্ব করতেন। এরাই ইতিহাসে বারভূঁইয়া নামে পরিচিত। এই জমিদারে মোঘলদের খবরদারি মেনে নেন মি, এমনকি তাদের অধীনতাও স্বীকার করেন নি। সম্রাট আকবর বহু চেষ্টা করেও বারভূঁইয়াদের পরাজিত করতে পারেন নি। তবে পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাদের পরাজিত করেছিলেন।
এরপর থেকে বাংলা মোঘলদের অধীনে থেকেই কখনো প্রত্যক্ষ আবার কখনো বা পরোক্ষ ভাবে পরিচালিত হতে থাকে। তবে শুরুর দিকে মোঘল সাম্রাজ্য যতটা শক্তিশালী থাকে, শেষের দিকে ঠিক ততোটাই দূর্বল হতে থাকে। শেষের দিকের সম্রাটদের বিভিন্ন ভুল, অভ্যন্তরীন রাজনীতি, ষড়যন্ত্র ইত্যাদির কারণে মোঘল সাম্রাজ্যে ভাঙ্গন দেখা দেয়। যার ফলে দিল্লী থেকে এত দূরের বাংলায় সরাসরি কর্তৃত্ব ধরে রাখা মোঘল সম্রাটদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই সুযোগ বাংলার নবাবরা নিজেদের সুবিধামতো নিজেদের রাজ্য পরিচালনা করতে পারতেন। তবে তারা কখনো মোঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন নি। বরং মোঘল সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক যশের কারণে তারা মোঘলদের কাছ থেকে সনদ নিয়ে নামমাত্র মোঘলদের অধীনে থেকে নবাবী কার্যক্রম চালাতেন। বাংলার ইতিহাসে এই সময়টা নবাবী আমল নামেই পরিচিত।
মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে মুর্শীদকুলী খানকে বাংলার দেওয়ান হিসেবে নিয়োগ দেন। তার হাত ধরেই বাংলায় স্বাধীন নবাবী শাসনের সূত্রপাত হয়। তৎকালীন বাংলার সুবেদারের সাথে বিরোধের জের ধরে মুর্শীদকুলী খান সম্রাটের অনুমতি নিয়ে বাংলার রাজস্ব আদায়ের দপ্তর ঢাকা থেকে মকসুদাবাদে স্থানান্তরিত করেন এবং নিজের নাম অনুসারে এর নাম রাখেন মুর্শিদাবাদ। পরবর্তীতে মোঘল সম্রাট ফররুখকীয়ার তাকে উরিষ্যা ও বাংলার সুবেদার হিসেবে নিয়োগ দেন। মুর্শীদকুলী খান তার এই দেওয়ানি ও সুবেদারি পদ একত্র করে নিজেকে নবাব এবং বাংলার নবাবী শাসনের সূত্রপাত করেন, যা পরবর্তীতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইংরেজদের বিরুদ্ধে পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়।
মোঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে। এই পতনের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়কে আধুনিক বাংলা বলা যেতেই পারে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোঘলদের হারানোর পর দীর্ঘদিন নিজেরাই পুরো ভারতবর্ষ শাসন করেছিল। এরপর ব্রিটিশ রাণীর হাতে ক্ষমতা তুলে নিয়ে কোম্পানি শাসনের অবসান হয়। পরবর্তীতে নানা সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের পর ভারতবর্ষকে ৩ টুকরা করা হয়। বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান। আমরা আমাদের আলোচনায় এই ২০০ বছরের ইতিহাস নিয়েই কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।