আলীকদম থেকে নৌকায় চড়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি কুরুকপাতার দিকে। নদী পথই একমাত্র সম্বল এখানে যোগাযোগের জন্য। প্রায় ঘন্টাখানেকের মতো লাগে সেখানে পৌছাতে। নৌকায় করে যতই এগুচ্ছি, একটু একটু করে মোবাইলের নেটওয়ার্ক সিগনাল কমে যাচ্ছিল। অবশেষে একেবারের জন্যই নেটওয়ার্ক চলে গেল। অর্থাৎ যাকে বলা যায় নেটওয়ার্কের বাইরে...
বর্ষাকাল প্রায় শেষ, তাই নদীতে তেমন একটা স্রোত নেই। অথচ ভরা মৌসুমে এই নদীতে নৌকায় করে যেতেও ভয়ংকর অনুভূতির তৈরি হয়। দুইপাশে বিশাল বিশাল পাহাড় আর মাঝখান দিয়ে একে বেকে চলে যাচ্ছে নদীটি। জনমানবশূন্য এইসব পাহাড়ের গহীনে যদিও এখনো বিভিন্ন আদিবাসীদের বসবাস রয়েছে। তেমন একটা দরকার না পড়লে এরা কেউ শহরের দিকে যায় না।
পাহাড়ের ভেতরেই জুম চাষের মাধ্যমে এরা এদের যাবতীয় চাহিদা মেটাতে পারে৷ বান্দরবানে থাকার সুবাদে তাদের জীবন ধারন নিয়ে মোটামুটি জানাশোনা আছে আমার। বিশেষ করে এইবার বান্দরবানের গহীনে ঘুরে আসার পর তাদের সম্পর্কে আরো বেশি করে জানার সুযোগ পেয়েছি আমি।
যায় হোক, আলীকদম, থেকে কুরুকপাতায় নৌকায় করে পৌছতে আমাদের প্রায় দুই ঘন্টার মতো লেগেছিল। যদিও নদীতে স্রোত খুব কম ছিল। এক্স্যদি স্রোত বেশি হত, তাহলে আমাদের আরো অনেক সময় বেশি লাগতো। সরু নদীতে স্রোতের বিপরীতে এইসব ছোট ছোট নৌকা তেমন একটা সুবিধা করতে পারে না।
বান্দরবানের এই দিকটাতে মানুষের ঘনত্ব তেমন একটা নেই। যতদূর চোখ যায়, শুধু বন আর ঘন জঙ্গল। নদীর দুই পাশের পাহাড় জুড়ে নানা ধরনের গাছগাছালিতে ভরপুর। এমন দৃশ্য বাংলাদেশের আর কোথাও দেখা সম্ভব না। আকাশে রোদের প্রচন্ড তাপে সবাই দিশেহারা হলেও চারপাশের এই অপরূপ সব দৃশ্য সবাইকে মোহিত করে রেখেছিল।
যত দূর এগিয়ে যাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন মানব বসতি থেকে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছি। যতদূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়। মাঝে মাঝে পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে স্থানীয় কিছু আদিবাসী মানুষের দেখা পাওয়া যায়৷ কেউ কেউ নিজের কাজ মনযোগের সাথে করছে, আবার কেউবা অতি উৎসাহী চোখে আমাদের নৌকার দিকে তাকিয়ে আছে৷ একটা সময় এই সব এলাকায় বাইরের কেউ আসতো না। কিন্তু এখন এইসব লোকেশন ও ট্রেকিং জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ায় দেশ বিদেশ থেকে প্রতিনিয়তই মানুষ আসে। ফলে ট্যুরিস্টদের মিলন মেলায় পরিনত হয় এসব এলাকা।
তবে লোকে লোকারণ্য মানুষের বাইরে এসে এধরনের সহজ সুন্দর স্থানে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারার মাঝেও অন্যরকম একটা আনন্দ আছে। সাধারন গড়পরতার জীবন ছেড়ে একটু অন্যরকম জীবন কাটাতে পারলে মন্দ কী? হোক না সেটা ২-৩ দিন। তবুও তো জীবনের দৈনিক রুটিনের বাইরে এসে একটু হলেও নিশ্চিন্তে নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ হয়, তাই না?
কুরুকপাতা বাজারে পৌছে আর্মি অফিসে গিয়ে নিজেদের এট্রি করিয়ে নিতে হয়। সেখান থেকে এন্ট্রি করিয়ে আবারও নৌকায় উঠে কিছুক্ষণ এগুনোর পর আমাদের নৌকার জার্নি শেষ হয়। এরপর পায়ে হেঁটে বাকিটা পথ যেতে হবে। আমাদের গন্তব্য হল হাজিড়াম পাড়া। সেখানে আজকের রাত কাটাতে হবে। হাজিড়াম পাড়া যাওয়ার সময় পুরোপুরি এডভেঞ্চারের স্বাদ পাচ্ছিলাম। সেই এডভেঞ্চারের গল্পগুলো পরের লেখায় করব...