পাড়া নিয়ে লিখতে বসেই বিপদে পড়ে গেলাম। আমার জন্ম যেখানে, মানে আমাদের গ্রাম, সেখানে আমার তেমন একটা থাকা হয় নি। বছরে একবার যেতাম, তাও ৪-৫ দিনের জন্য। বাবা সরকারি চাকরিজীবি ছিলেন। উনার পোস্টিং ছিল বান্দরবানে। সে হিসেবে আমি বড় হয়েছি এখানেই। এখানেই আমার সবকিছু। তাই পাড়া নিয়ে যেহেতু লিখতেই হবে, তাই আমি বান্দরবান নিয়েই লিখতে বসলাম।
(আমাদের পাড়া)
আমি যেখানে থাকি, জায়গাটার নাম লামা। আমাদের পাড়া চেয়ারম্যান পাড়া হিসেবেই পরিচিত। পার্বত্য বান্দরবান জেলার ছোট একটা গ্রাম। দুই পাশে দুই পাহাড়ের মাঝখানে এটির অবস্থান। এক পাহাড়ের নাম সুখু, অন্য পাহাড়ের নাম দুখু। পাহাড়ের উপর উঠলেই মনে হবে যেন মেঘ ধরা যায়। পাশেই ছোট্ট নদী মাতামুহুরী, যা সাঙ্গু নদী হয়ে কর্ণফুলির সাথে মিশে বঙ্গপোসাগরে কাছে চলে গিয়েছে। আমার পুরো ছোটবেলা এইসব পাহাড়, জঙ্গল আর নদীর সাথেই কেটেছে।
(মাতামুহরি নদী)
আমাদের পাড়ায় বাঙালি-অবাঙালি সবাই মিলেমিশেই বাস করে। আমার বন্ধুদের মাঝে হিন্দু-মুসলিম, আদিবাসী, চাকমা, বম সহ সবধরনের মানুষই আছে। ছোটবলায় স্কুল ফাঁকি দিয়ে আমরা পাহাড়ের জঙ্গলে চলে যেতাম। সেখানে চাকমাদের কলার বাগান আছে। আমরা মাঝে মাঝে সেখান থেকে কলা চুরি করে নিয়ে আসতাম। জানি কাজটা ভাল না, কিন্তু তখন তো ছোট ছিলাম। এই কাজগুলো করতে ভালই লাগতো।
(পাড়ার বন্ধুদের সাথে)
(পাহাড়ের উপরের কলাবাগান)
আমাদের পাড়ার ছেলেরা খেলাধূলায় অন্য এলাকা থেকে যথেষ্ঠ ভাল। প্রায় কয়েক মাস পর পর এক পাড়ার সাথে অন্য পাড়ার বিভিন্ন রকম টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। বেশিরভাগ সময়েই আমরা জয়ী হই।
(আমাদের খেলার মাঠ)
আগেই বলেছি, আমাদের লামা ছোট একটা নদীর পাশেই অবস্থিত। যার ফলে প্রায় বর্ষাকালেই বন্যার মুখে পড়তে হয় আমাদের। দুই বছর আগেও হুট করে প্রবল পাহাড়ি ঢলে পুরো এলাকা প্রায় অর্ধেক ডুবে গিয়েছিল। ভাগ্য ভালো যে আমাদের কোয়ার্টার দুই তলা ছিল বিধায় আমাদের তেমন ক্ষতি হয় নি। তবে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন সেবার। টানা দুইদিন পাহাড়ের উপর সরকারি নিরাপত্তা কেন্দ্রে কাটাতে হয়েছিল অনেককে।
(বন্যায় ডুবন্ত রাস্তা)
যায় হোক, বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর এলাকাগুলোর মাঝে আমাদের পাড়া হয়তো প্রথম সারির দিকেই থাকবে। পাহাড়, নদী, জঙ্গল, মানুষ, পশুপাখির মিশেলে অদ্ভুত সুন্দর এক গ্রাম আমাদের। খুব ভোরে পাহাড়ের ওপাশ থেকে যখন একটু একটু করে যখন সূর্যটা উঠতে শুরু করে, সেই দৃশ্যের সাথে পৃথিবীর অন্য কোনো দৃশ্যের তুলনা করা চলে না।
(পাহাড়ের উপর মেঘের খেলা)
চাকরির খাতিরে গত এক বছর ধরে ঢাকায় আছি। কিন্তু ঢাকাকে এখনোও আপন করতে পারি নি। অল্প কয়েকজন মানুষ ছাড়া এখানে পরিচিত কেউ নেই। এই লেখাটা যখন লিখছি, তখন আমার পাশের বাসায় যিনি আছেন, তার নামটাও মনে করতে পারছি না। আশেপাশের কারো সাথে কথা হয় না, সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। মাঝে মাঝে দেখা হলে "হাই-হ্যালো" ছাড়া তেমন কোনো কথাও হয় না। অথচ লামায় প্রতিটা মানুষ আমার পরিচিত, কাছের মানুষ সবাই। যে কোনো উৎসবেই আমরা সবাই একসাথে পালন করি। তা সেটা ইদ হোক বা পূজা, নববর্ষ।
(আমাদের পাড়ার পুকুর)
সত্যি কথা বলতে কি, আমার পুরো শৈশব আর কৈশোর কাল খুব আনন্দেই কেটেছে এত সুন্দর একটা জায়গায় বসবাস করতে পেরে। সারাজীবন হয়তো এখানে কাটাতে পারবো না। তবে যতদিন আছি, সবার সাথে আনন্দ করে মিলেমিশে কাটাতে চাই।