শ্মশান ঘাট পার হয়ে একটু এগিয়ে যেতেই নরেন পথের বাম দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে জানালো, ঐখানে একসময় নরবলি দেয়া হতো। হালকা চাঁদের আলোয় সেদিকে তাকিয়ে ইকবাল তেমন কিছু একটা দেখতে পেল না। তবুও নরবলি শব্দটা শোনা মাত্রই কেমন যেন অদ্ভুত এক অনুভূতি শিরদাড়া বেয়ে নিচে নেমে গেল। বাতাসে ভেজা গন্ধের সাথে কেমন যেন পোড়া একটা গন্ধও পাওয়া যাচ্ছিল৷ মনে হচ্ছিল এই বুঝি স্মশান ঘাটে কাউকে পুড়িয়ে রেখে যাওয়া হয়েছে। জায়গাটা দ্রুত পার হওয়ার জন্য তাই পায়ের গতি বাড়িয়ে দিল সে। ব্যাপারটা চোখ এড়ালো না নরেনের। মুখের হাসি চাপা দিয়ে ইকবালকে অভয় দিয়ে বলল, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই মশাই, যেখানে ব্রাহ্মণরা থাকে, সেখানে ভূত প্রেত আসে না।" কথাটা শুনে ভাল লাগল না ইকবালের। ভূত, প্রেত বিশ্বাস করে না সে। অবশ্য শহরে লাখ লাখ মানুষের সামনে বসে এই বিশ্বাসটা খুব জোরে প্রচার করা গেলেও এরকম একলা নির্জন কোনো এলাকায় এসে শ্মশান ঘাটের পাশে কিন্তু ভিন্ন বিষয়।
Source : Pixabay
ছোটবেলায় ভূত অরেত নিয়ে নানা ধরনের কল্প, কাহিনী, গল্প লোকমুখে প্রচলিত। ছোটবেলায় এসব শুনে মায়ের আঁচলের নীচে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো ছোট ছোট বাচ্চারা। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই ভয়টা কেটে যায়৷ কিন্তু তবুও মাঝে মাঝে হুট হাট অদ্ভুত এক শিহরন কেন এসে ভর করে, তা বলা মুশকিল। ইকবালের ব্যাওয়ারটাও তেমনই৷ জায়গাটা দ্রুত পার হতে চাইছে সে।
ঠান্ডা বাতাসে পুরো শরীর জমে গিয়েছে তাদের দুইজনেরই। নরেনের অবশ্য এই ঠান্ডার অভিজ্ঞতা বেশ ভালই আছে, কিন্তু ইকবালের জন্য তা একেবারেই নতুন৷ বৃষ্টিতে পুরো শরীর এমনিতেই ভিজে আছে৷ তার উপর আবার ঠান্ডা বাতাস। অনেক্ষণ ধরেই থরথর করে কাঁপছে সে৷ তার উপর প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে এতটা পথ হাঁটতে হাঁটতে পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সে৷ তবুও মনের জোরে সবটুকু শক্তি একত্রিত করে এগিয়ে চলছে সে।
শহর থেকে সকাল সকাল ট্রেইনে চড়ে হরিপুরের দিকে রওয়ানা দিয়েছিল ইকবাল৷ বিকেলের মাঝেই পৌছে যাওয়ার কথা, কিন্তু পথে ক্রসিং এর কারণে ঘন্টা পাঁচেক দেরি হয়ে গিয়েছে তার। হরিপুরে কোনো স্টেশন নেই। একটু দূরের মহাদেবপুর স্টেশনে ট্রেইন থামে। সেখান থেকে গরুর গাড়িতে চড়ে হরিপুর আসতে হয়। কিন্তু এত রাতে স্টেশনের বাইরে কোনো গাড়ি ছিল না৷ ট্রেইন থেকে নেমে এমন ঘুটঘুটে জনমানবহীন স্টেশন দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিল ইকবাল৷ স্টেশনের ভেতরে ভাঙ্গা একটা রুম থেকে অবশ্য হারিকেনের টিমটিমে আলো প্লার্টফর্ম চত্ত্বরে পড়ছিল। সেই টিমটিমে আলোয় দেখা হয়ে গেল হরেন ঠাকুরের সাথে৷
ট্রেইন থেকে নেমে জনমানবশূন্য অন্ধকার প্লার্টফর্মে ইকবালকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হরেন নিজেই এগিয়ে এসেছিলেন৷ জানতে চাইলেন ইকবালের কাছে যে সে কোথায় যাবে। অপরিচিত মানুষের সাথে হুট করে কথা বলতে ইকবালের অস্বস্তি হচ্ছিল। বিষয়টা বুঝতে পেরে হরেন নিজের পরিচয় দিলেন যে তিনি মহাদেবপুর স্টেশনের স্টেশন মাস্টার। এবার যেন স্বস্তি ফিরে ফেল ইকবাল। জানাল হরিপুর যাবে, কিন্তু কোনো গাড়ি নেই৷ হরেন হেসে বললেন, এত রাতে কেউ গাড়ি নিয়ে এখানে বসে থাকে না মশাই, যেতে হলে হেঁটে যেতে হবে৷
ঢোক গিলল ইকবাল। মহাদেবপুর থেকে হরিপুরের দূরত্ব কম করে হলেও ৬-৭ কিলোমিটার তো হবেই। এখানে আসার আগেই সবকিছু জেনে নিয়েছিল সে৷ এত রাতে একা একা এত দূর হেঁটে যাওয়া ইকবালের পক্ষে সম্ভব না৷ তবে ইকবালের দেহে প্রাণ ফিরে এল যেন নরেনের কথায়। নরেন জানাল হরিপুর যাওয়ার শর্টকাট একটা রাস্তা আছে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে৷ সে নিজে প্রতিদিন রাতে এই পথ ধরেই বাড়ি ফিরে। বিকেলের পর মহাদেবপুর স্টেশনে আর কোনো ট্রেইন থামে না৷ তাই প্রতিদিন বিকেলেই বাড়ি ফিরতে পারে সে। কিন্তু আজ ট্রেইন লেইট করায় তারও বাড়ি ফিরতে লেইট হয়ে গিয়েছে। ইকবাল যদি চায়, তবে সে তার সাথেই হরিপুর পর্যন্ত যেতে পারবে৷
প্রস্তাবটা মন্দ মনে হয় নি ইকবালের৷ এছাড়া অবশ্য আর কোনো পথও খোলা নেই৷ নির্জন এই স্টেশনে সারারাত কাটানো সম্ভব না৷ তাই বিনা দ্বিধায় হরেনের প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেল যে৷ হাতে মাঝারি সাইজের এক হারিকেন নিয়ে হরিপুরের উদ্দেশ্যে হাটতে শুরু করল হরেন। আর তার পিছু পিছু সুবোধ বালকের মতো এগিয়ে যাচ্ছে ইকবাল।
ঘন ঝোপঝাড়ের মাঝ দিয়ে কতক্ষণ ধরে এভাবে তারা হেঁটে চলছে জানে না৷ অন্ধকারে ঘড়ির সময় দেখারও সুযোগ নেই৷ তবে ইকবালের মনে হল প্রায় ঘন্টাখানেক সময় পার হয়ে গিয়েছে৷ ইকবালের আন্দাজ ভুলও হতে পারে৷ কিন্তু এতক্ষণ ধরে হাঁটতে হাটতে সে ক্লান্ত অনুভব করছিল। কোথাও বসে যে একটু জিরোবে, সেই সুযোগও নেই৷ এমন সময় সেই শ্মশান ঘাটে এসে পৌছেছিল তারা। শ্মশান ঘাটের পাশেই যে বলি দেয়ার স্থান ছিল, নরেন সেদিকেই এগুতে লাগল। এবার কিছুটা ভয় পেলে ইকবাল৷ তার ভয়ের বিষয়টা হয়তী এবারও আন্দাজ করে ফেলেছে নরেন৷ সেজন্য হাসতে হাসতে বলল, "এতক্ষণ এতটা পথ হেটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি৷ একটু বিশ্রাম নেয়া দরকার। ওদিকে বসার সুন্দর জায়গা আছে৷ কিছুক্ষণ বসে জিরাতে পারলে শরীরের ক্লান্তি ভাব দূর হয়ে যাবে।"
এবার নিজের ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারল না ইকবাল। কিছুটা বিরক্তির সুরেই বলল, "সেই কখন থেকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। হরিপুর পৌছতে আর কতক্ষণ?" হরেন বলল, এত অস্থির হচ্ছেন কেন মশাই? এইতো চলে এসেছি প্রায়৷ কিন্তু এধরনের উত্তরে ইকবাল সন্তুষ্ট না৷ কিন্তু কথায় আছে না, পড়েছি মোঘলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে? ইকবালেরও হয়েছে সেই অবস্থা৷ রাগ কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, তাহলে আর এখানে বিশ্রাম নিয়ে লাভ কী? একেবারে হরিপুর গিয়েই বিশ্রাম নেয়া যাবে৷ আপনি এগিয়ে চলুন।
হরেন কিছু বলল না। আপন মনে শিষ বাজিয়ে আবারও হাঁটতে শুরু করল। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই দূরে সামান্য আলো দেখা গেল৷ খুব সম্ভবত কোনো বাড়িতে আলো জ্বলছে এখনো। হালে কিছুটা পানি ফিরে ফেল ইকবাল৷ হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল আলোর উদ্দেশ্যে৷ অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই ছোট একটা ঘরের সামনে উপস্থিত হল তারা। ঘরের বারান্দায় হারিকেল জ্বলছে৷ তার পাশেই বৃদ্ধ এক লোক শুয়ে ছিল।
এত রাতে মানুষের সাড়া শব্দ পেয়ে উঠে বসল সেই বৃদ্ধ৷ হারিকেনের সলতেটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে খানিকটা উঁচু করে ধরে জিজ্ঞাসা করল, কে ওখানে? ইকবাল ততক্ষণে কিছুটা কাছে এসেছে পড়েছে। বৃদ্ধের প্রশ্নের উত্তরে জবাব দিয়ে বলল, এইটা কি হরিপুর গ্রাম?
বৃদ্ধ কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, এটা হরিপুর হতে যাবে কেন? এটা তো মহাদেবপুর৷ ইকবাল বিব্রত ভঙ্গিতে পেছনের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল, "কিন্তু আপনাদের স্টেশন মাস্টার তো আমাকে তার সাথে করে হরিপুর যাবে বলে এখানেই নিয়ে এলেন৷ কিন্তু পেছনে তাকিয়ে মুহুর্তের জন্য অবাক হয়ে গেল৷ কারণ পেছনে কেউ ছিল না। এবার বৃদ্ধ কিছুটা নড়েচড়ে বসে বললেন, " তুমি কি নরেনের কথা বলছ?"ইকবাল সাথে সাথে হ্যাঁ বলল৷ কিন্তু বৃদ্ধ বলে উঠল, তা কী করে সম্ভব? নরেন ঠাকুর তো আজ সকালেই মারা গেল। আমরা তো কিছুক্ষণ আগেই তাকে শ্মশানঘাটে দাহ করে আসলাম!