আজকে ৯ মে, মা দিবস। যদিও মায়ের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না, তবুও আজকের দিনকে একটা বিশেষ দিন হিসেবে গ্রহন করা যায়। মায়ের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা প্রকাশের জন্য এই দিনটি সারা পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই পালন করা হয়।
আধুনিক মাতৃ দিবসের সূচনা হয় ১৯১২ সালে আনা জার্ভিসের স্থাপিত "ইন্টারন্যাশনাল মাদার্স ডে এসোশিয়েশন" সংগঠনটির মাধ্যমে। যদিও অনেকের মতে প্রাচীন গ্রীসের মাতৃ আরাধনার প্রথা থেকে এই মা দিবসের উদ্ভব।
মা দিবসটিকে মায়ের প্রতি আলাদা ভাবে সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বর্তমানে বহুল ভাবে ব্যাবহৃত হয়। ফেসবুকে বন্ধুদের দেখলাম মা কে নানা রকমের স্মৃতিময় লেখা লিখে যাচ্ছে। বন্ধুদের দেখে আমারও কিছু লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে, তাই লিখতে শুরু করলাম।
প্রথমেই বলে নিই, আমার স্মৃতিশক্তি খুবই দূর্বল। ছোটবেলার খুব কম স্মৃতিই আমার মনে আছে। তবে মায়ের চেয়ে বাবার সাথের স্মৃতিগুলোই আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে আছে।
হুমায়ূন আহমেদের একটা কথা আছে, **"পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই।" যদিও আমি এই কথার সাথে একমত না। পৃথিবীতে খারাপ বাবা অবশ্যই আছে। আমার কাছে বরং মনে হয় পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ থাকলেও খারাপ মা নেই। শত কষ্টের মাঝেও মা তার সন্তানকে ছেড়ে যান না।
আমরা যারা মধ্যবিত্ত, তাদের বাড়ির ছোট একটা চিত্র তুলে ধরা যাক। আমরা যখন সবাই বাড়িতে একসাথে খেতে বসি, মা কিন্তু আমাদের সাথে খান না। আমাদের সবার খাওয়া শেষ হলে যতটুকু বাকি তাকে, ততটুকু দিয়েই নিজের খাবার শেষ করেন। কখনো খাবারের সংকট হলে না খেয়ে বলেন খিদে নেই। কম বেশি সবাই ওই চিত্রটুকুর সাথে পরিচয় আছে বলে আমি মনে করি।
মাছ কিংবা মাছের টুকরো গুলো অন্যদের খাবারের পাতে তুলে দিয়ে নিজের জন্য কিছুই রাখেন না একজন মা। নিজের অনেক শখ কিংবা চাহিদা বিনা দ্বিধায় সংসার ও সন্তানদের জন্য স্যাক্রিফাইস করেন তিনি। ছোটবেলায় আমরা অনেক কিছুর জন্য বায়না ধরতাম। সব বায়না হয়তো পূরণ হতো না। তখন মায়ের উপর আমাদের অনেক রাগ হতো। আমাদের রাগ কিংবা কান্না দেখে একটা সময় পর নিজের জমানো টাকা থেকে আমাদের সেসব চাহিদা পূরণ করতেন তিনি। ছোটবেলায় বিষয়গুলো বুঝতে পারতাম না। বড় হওয়ার পর ধীরে ধীরে বিষয়গুলো বুঝতে শিখেছি।
আমাদের পরিবারে আমরা চার ভাই এক বোন। অর্থাৎ আমরা পাঁচ ভাই বোনের শেষ আশ্রয়স্থল হল আমাদের মা। বাবা সারাক্ষণ অফিসের কাজে ব্যস্ত। তেমন একটা কাছে পাই নি। মাঝে মাঝে হুট হাট তিনি আমাদের সময় দিতে পারতেন। আর মা কে তো যখন ইচ্ছে, তখনই কাছে পেতাম। একদম ছায়ার মতো সারাক্ষণ তিনি আমাদের পাশেই থাকতেন।
বিপদে আপদে যে কোনো সময় তিনি আমাদের মুখ দেখেই আন্দাজ করে ফেলতে পারেন যে আমাদের কোনো বিপদ হয়েছে কিনা। উনি একটা কথা প্রায়ই আমাদের বলেন। আর তা হলো, "পাড়া পড়শীর চেয়ে মায়ের মন আগে জাগে।" অর্থাৎ সন্তানের যে কোনো বিপদ আপদ ঘটলে মা সবার আগে টের পান। এবং এইটাই সত্যি। যতবার বড় কোনো বিপদে পড়েছি, ততবারই দেখেছি যে আমার মা কোনো না কোনো ভাবে আগে ভাগেই তা টের পেয়ে যান।
আমার মা আমাদের জন্য জীবনে কম স্যাক্রিফাইস করেন নি। নিজের সারা জীবন আমাদের পাঁচ ভাই বোনকে মানুষ করার জন্য কাজ করে গেছেন। একটা ছোট ঘটনা বলা যাক। আমি যখন কলেজে উঠি, তখন হোস্টেলে থাকার ব্যাবস্থা করতে হয়েছিল। তো বাড়ি থেকে যেদিন চলে যাবো, সেদিন উনি উনার কানের দুল বিক্রি করে সেই টাকা আমাকে দিয়েছিলেন। দুলটা অনেক পুরানো ছিল। প্রথমে জানতাম না যে উনি উনার দুল বিক্রী করে দিয়েছিলেন।
অনেক পরে একদিন এই কথাটা বলেছিলেন। যেদিন জানতে পেরেছিলাম এটা, খুব খারাপ লেগেছিল। পরে অবশ্য টিউশনের টাকা জমিয়ে উনাকে এক জোড়া ছোট দুল কিনে দিয়েছিলাম।
স্মৃতি ঘাটলে এরকম অসংখ্য ছোট খাটো ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে। মায়েদের এসব কষ্টের ঋণ কখনো শোধ করা সম্ভব না। তবে মায়ের মুখে খুব সহজেই হাসি ফুটানো যায়। চেষ্টা করে যাবো আজীবন মায়ের মুখের হাসিটুকু আগলে রাখার জন্য।