এক মুঠো শৈশব যখন ফিরে আসে...

Words
610
Reading
3 min
Listen
Play
5y

img_0.8393833174313021.jpg

গতকাল সন্ধ্যার পর পরিবেশ থমথমে ছিল। রাত ৯ টার পর হুট করে বাতাস শুরু। এদিকে গাছপালা অনেক বেশি। ফলে বাতাসের প্রচন্ড আওয়াজ আর ধুলোবালিতে অবস্থা একদম খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে আধ ঘন্টার মতো শো শো বাতাসের পর যখন বৃষ্টি পড়া শুরু হল, তখন ধুলাবালির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম।

এই বছরের প্রথম কালবৈশাখী কাল দেখে ফেললাম। বাতাস শুরু হবার সাথে সাথেই কারেন্ট চলে গিয়েছিল। টাকা ২ ঘন্টার মতো তুফান চলেছিল। কিন্তু কারেন্ট আসছে রাত তিন টার দিকে।

রাতে কারেন্ট ছিল না, তাই রান্না বান্না আর করি নাই। বাইরে তুফান হচ্ছিল, আর আমরা সবাই এক রুমে বসে কারেন্ট এর জন্য ওয়েট করছিলাম আর আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ এক বন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে বলল এভাবে বসে না থেকে বাইরে যাওয়া উচিত। আমরা তো সবাই অবাক, কী বলে এই পাগল? এই ঝড় বৃষ্টিতে বাইরে যাবো কেন? আমরা কিছু বলার আগেই যে ব্যাগ একটা নিয়ে প্রস্তুত বাইরে যাওয়ার জন্য।

হাতে ব্যাগ কেন জিজ্ঞাসা করতেই বলল, মাঠের একদম শেষ কোনায় বড় একটা আম গাছ আছে। এবার ভালই আম ধরেছে। যেরকম তুফান হচ্ছে, এতক্ষণে গাছের নিচে অনেক আম ঝরে পড়ে থাকার কথা। চিন্তা করে দেখলাম, কথাটা মন্দ বলে নাই। শেষ কবে এরকম ঝড় বৃষ্টিতে বাইরে বের হয়ে আম কুড়িয়েছিলাম, মনে নেই। খুব ছোটবেলায় আমাদের কোয়ার্টারের ভেতর বেশ কয়েকটা আম গাছ ছিল। তখন গাছে উঠে উঠে আম পেরে খেতাম। আর বৃষ্টির সময় সুযোগ পেলেই গাছের নিচের আম কুড়াতাম। বড় হবার পর আর কখনো সেই সুযোগ পাই নি। তো আজ যেহেতু হাতে সুযোগ আছেই, তো সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে সমস্যা কী?

img_0.5720153293658597.jpg

যেই ভাবা সেই কাজ। আমরা ছিলাম ৮ জন। ৩ জন রাজী হলেও বাকি ৫ জন এই অবস্থায় বাইরে যেতে একদমই নারাজ। কী আর করার, আমরা ৩ জন মিলেই বৃষ্টিতে ভিজে দৌড়াতে দৌড়াতে কয়েক মিনিটের মাঝে আম গাছের নিচে চলে গেলাম।

এমনিতেই প্রচমড বাতাস, বৃষ্টি, তার উপর ভালই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। একটু ভয় ভয় লাগলেও অন্যদের দেখাদেখি তাল মিলিয়ে চলে গিয়েছিলাম। যাওয়ার সময় ভাবছিলাম এত রাতে হয়তো ওখানে কেউ থাকবে না। কিন্তু মজার বিষয়, আমাদের আগে আরো ২-৩ টা গ্রুপ এখনে এসে আম কুড়ানো শুরু করে দিছে।

মনে মনে একটু খারাপও লাগছিল। মনে হচ্ছিল এত কষ্ট করে আসলাম, অথচ একটা আমও হয়তো পাবো না। তবুও খুজাখুজি শুরু করে দিয়েছিলাম।

আমরা ওখানে পৌছানোর কিছুক্ষণ পরেই তুফান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বৃষ্টি ঠিকই পড়তেছিল। এই সময়টাতে আমরা গাছের আশেপাশের সবখানে খুঁজে খুঁজে ৩ জন মিলে ১২-১৩ টার মতো আম খুঁজে পেয়েছিলাম। আমাদের আগে যারা গেছে, তাদের কুড়িয়ে পাওয়া আমের সংখ্যা আরো বেশি। তুফান বন্ধ না হয়ে আরো কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো আরো কয়েকটা আম বেশি পেতে পারতাম।

যায় হোক, এইরকম সময়ে যে এই কয়েকটা আম পেয়েছি, সেইটাই তো অনেক বেশি, তাই না? বিশেষ করে আজ এত বছর পর ছোটবেলার মতো কিছু অনুভূতি যে আবারও ফিরে ফেলাম, সেটাই বা কম কী?

রুমে আসার পর আমাদের সাথে না যাওয়া বাকি পাঁচজন দেখলাম লবন মরিচ মাখিয়ে বসে আছে আমাদের জন্য। প্রথমে ভাবছিলাম, এত কষ্ট করে ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে আমরা এই কয়েকটা আম কুড়িয়ে আনলাম, এগুলা অন্য কাউকে দেয়া যাবে না। পরে চিন্তা করলাম, কষ্ট যখন করছি, তখন সবাই মিলে মিলেমিশেই খাই।

img_0.1323459714343517.jpg

ছোটবেলায় এইসব টক জিনিসের প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল। কিন্তু বড় হবার পর কিছুটা হলেও আকর্ষণ চলে গেছে। এখন আর তেমন একটা খাওয়া হয় না। তবে সত্যি বলতে, কাল রাতে অনেক ভাল লেগেছিল। একে তো বাইরে বৃষ্টি, তার উপর কারেন্ট নাই। এই অবস্থায় সবাই মিলে একসাথে বসে কাঁচা আম লবন-মরিচ মাখার সাথে মিশিয়ে খাওয়ার যে মজা, তার তুলনা কিসের সাথে দিব, তা ভেবে বের করতে পারছি না আমি।

রাত দুইটার দিকে বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। শেষ কয়েকদিন যেভাবে গরম পড়েছিল, তাতে সবাই অপেক্ষায় ছিল, কবে বৃষ্টি নামবে আর কবে প্রকৃতি একটু শীতল হবে। অবশেষে যেন সেই বহুল প্রতিক্ষিত বৃষ্টি আকাশ থেকে ধরায় নেমে এসেছে। আমরা সারারাত জেগে জেগে কাল রাতে আড্ডা দিয়েছিলাম। কারেন্ট ছিল না, আর কারো মোবাইলে চার্জও ছিল না। এরকম জমপেশ আড্ডা সবসময় দেয়ার সুযোগ হয় না।

এক মুঠো শৈশব যখন ফিরে আসে... | Ecency