ঢাকা শহরের ভেতর যতগুলো পার্ক আছে, সেগুলোর মাঝে সবচেয়ে সুন্দর হল রমনা পার্ক। যদিও রমনা পার্কে খুব একটা যাওয়া হয় নি আমার। প্রথমবার গিয়েছিলাম সম্ভবত ২০১৬ সালের দিকে। এরপর আর কখনো যাওয়া হয় নি। তবে এই একদিনেই পুরো পার্ক জুড়ে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রেখে গিয়েছিলাম। গতকাল বিকেলে শাহবাগ পার হবার সময় চোখের সামনে পার্কটা চোখে পড়ায় খুব ইচ্ছে হচ্ছিল পার্কটার ভেতরে ঢুকার।
কী আর করার! ইচ্ছেকে তো পাত্তা দিতেই হবে। তাই বাস থেকে নেমে সোজা পার্কের ভেতর চলে গিয়েছিলাম।
যেহেতু শুক্রবারের ছুটির দিন, তাই কাল বিকেলের পর থেকে বেশ ভালই ভীড় ছিল। পুরো সপ্তাহ ব্যাস্ত থাকা মানুষেরা তাদের পরিবার, পরিজন কিংবা প্রিয় মানুষদের নিয়ে কিছুটা ভাল সময় কাটাতে পার্কে চলে এসেছে। কাল আকাশের অবস্থা অবশ্য খুব একটা ভাল ছিল না। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। এই বৃষ্টির মাঝেই সবাই তাদের প্রিয় মানুষ ও পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছিল। দৃশ্যটা আসলেই সুন্দর।
রমনা পার্কের ইতিহাস অবশ্য খুব পুরানো। উইকিপিডিয়া অনুসারে ১৬১০ সালের দিকে অর্থাৎ মোঘল আমলে এই পার্কটি তৈরি করা হয়। বিশাল এলাকা নিয়ে নির্মিত এই পার্কটি যে খুব যত্ন নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, তা তো স্পষ্টই বুঝা যায়। এই পার্কের নামকরনের পেছনে বিশেষ কোনো ইতিহাস আছে কিনা জানি না, তবে মোঘলরাই এই পার্কের নামকরন রমনা করেছিল, যা এখনো বহাল তবিয়তেই আছে।
প্রায় ৬৮.৫ একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই পার্কটি অবশ্য পূর্বে আরো বড় ছিল। ১৮২৫ সালে পার্কটির সংস্কারের সময় এর আয়তন ছিল ৮৯ একর। তখন অবশ্য এই পার্কের সাথে একটা চিড়িয়াখানাও ছিল।
প্রায় চারশো বছরের পুরানো এই পার্কের সাথে যে কত ইতিহাস জড়িয়ে আছে, তার কথা হয়তো কেউ জানে না। নানা প্রজাতির গাছ পালা, ফুল, লেকের সমন্বয়ে গঠিত এই পার্কটির সৌন্দর্য সত্যিই অতুলনীয়। এরকম কিছু কিছু পার্ক আছে বলেই ঢাকা শহরের মানুষেরা এখনো কিছুটা হলেও প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
২০১৫ সালের দিকে এখানে অবশ্য বিশেষ একজন মানুষের সাথে এখানে এসেছিলাম। সেই স্মৃতির রেশ তো এখনো কিছুটা টিকে আছে মনে। আর সেজন্যই হয়তো কাল হুট করে রমনা পার্কে ঢুকে পড়েছিলাম। আরো মজার বিষয় হল, প্রথমবার যখন গিয়েছিলাম সেখানে, তখন বৃষ্টি ছিল। সেদিনের মতোই গতকালও ঠিকই টিপটিপ বৃষ্টি ঝড়ছিল।
এরকম বিকেলে বৃষ্টিতে ভিজতে অবশ্য মন্দ লাগে না। তাই আমিও অরায় ঘন্টাখানেকের মতো পার্কের এপাশ থেকে ওপাশ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হেটে বেড়িয়েছি আর মানুষের উচ্ছ্বলতা খুঁজে ফিরেছি। পরিবারের সাথে সময় কাটানোর মুহুর্তগুলো যে প্রতিটা মানুষের জন্য অতি আনন্দের, তা পার্কের ভেতর ঘুরে বেড়ানো মানুষের মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছিল।
তবে পার্কের ভেতর ছোট একটা মজার ঘটনাও চোখে পড়েছিল। যা দেখে আমার নিজের ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছিল। পার্কের এক কোণায় বেশ কিছু আম গাছ ছিল। গাছগুলো ভালই আম ধরেছে। কিছু অল্প বয়স্ক ছেলে মেয়ে ঢিল ছুড়ে গাছ থেকে আম পারার চেষ্টা করছিল। বেশি আম অবশ্য পারতে পারে নি। তার আগেই সিকিউরিটির লোকেরা বাঁশি বাজাতে দৌড়ে চলে আসছিল। আর তাদের দেখে আম চুরি করতে চাওয়া ছেলেগুলোর ভোঁ দৌড়।
ছোটবেলায় আমরাও এরকম ঢিল ছুড়ে মানুষের বাসা থেকে আম চুরি করার চেষ্টা করতাম। বাড়ির মালিক তেড়ে আসলে সবকিছু ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যেতাম। সেই সব স্মৃতি মনে করে আমারও ইচ্ছে হচ্ছিল ছেলেদের সাথে চুরিতে শামিল হতে। অনেক কষ্টে অবশ্য সেই লোভ সংবরন করতে হয়েছিল।
যায় হোক, সবকিছু মিলিয়ে যে কিছুক্ষণ পার্কে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম, বেশ ভালই লেগেছিল। বিশেষ করে পার্কের ভেতরের অপরূপ সুন্দর রূপ তো যে কারো মনকেই বিমোহিত করে দিতে পারে। আমাকেও দিয়েছিল। তার উপর নিজের হারিয়ে ফেলা পুরানো সব স্মৃতি তো ছিলই...