"যেদিন আমি হারিয়ে যাব বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুষবে....."
ব্রেকাপ করার আগে বেশ কিছু মাস নিশাত প্রায়ই কাজী নজরুলের এই কবিতাটা আমাকে পাঠাতো। আমি পড়তাম আর হাসতাম। তখন পর্যন্ত ভাবতেও পারি নি যে আমাদের সম্পর্কের শেষ হতে যাচ্ছে। অবশেষে যেদিন রাতে সে আমাকে জানিয়েছিল যে তার পক্ষে আর এটা কন্টিনিউ করা সম্ভব না, আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল।
ব্রেকাপের পর নিজেকে সামলে নেয়া জরুরী ছিল। জমানো কিছু টাকা সাথে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্যহীন ভাবে সারাদিন রাস্তায় ঘুরাঘুরি করে রাতের বাস ধরে চলে যাই পাহাড়ের দেশ বান্দরবানে। বান্দরবানের সময়টা ভাল-খারাপ মিলিয়ে ছিল। সারাদিন পাহাড় আর জঙ্গলে ঘুরতাম, ভালই কেটে যেত। শুধু রাত হলেই সমস্যা। বিছানায় গা এলানোর সাথে সাথে কল্পনায় নিশাতের মুখটা ভেসে আসতো। সারা শরীরে যন্ত্রনা শুরু হতো।
নিঃসঙ্গ জীবনে এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়েছিল। লোকটি আগে কি ছিলেন জানি না, তবে এখন সব ছেড়ে দিয়ে নিজের জীবনটা উপভোগ করছেন শুধু। উনি খুব ভাল কাঠের কাজ জানতেন। অবসরে বসে বসে ঠুক ঠুক করে কাঠ দিয়ে পুতুল, হাতি, ঘোড়া অনেক কিছু বানাতেন। উনার কাজ সত্যিই প্রশংসা করার মতো ছিল।
একদিন উনি আমাকে একটা কাঠের পুতুল দিয়েছিলেন। মেয়ে আকৃতির এই পুতুলের বুকে সুন্দর করে নিশাত নামটা লেখা আছে। পুতুলটা দেয়ার সময় ভদ্রলোক বলেছিলেন, বেশি মন খারাপ হলে একলা কখনো পুতুলটাকে নিয়ে বসতে। পুতুলটার দিকে এক দৃষ্টিতে অনেক্ষন তাকিয়ে থাকলে নাকি এটা নিজে থেকে কথা বলা শুরু করবে। সেদিন রাতেই বুঝেছিলাম যে ভদ্রলোকের মাথায় সামান্য হলেও সমস্যা আছে।
তবে ভদ্রলোকটির দেয়া কাঠের পুতুলটি আমার ভালই কাজে এসেছিল। মাঝে মাঝে রাতে খুব বেশি খারাপ লাগলে পুতুলটির সামনে বসে আপন মনে কথা বলতাম। নিজের ভেতরের সব জমানো কষ্ট, অভিমান, রাগ একটার পর একটা বলে যেতাম। পুতুলটি আমার কথার জবাব কখনোই দেয় নি, কিন্তু মনে হত যেন এটি খুব আগ্রহের সাথে আমার কথা শুনছে।
এর কিছুমাস পর সবকিছু প্রায় ঠিক ঠাক। এখন আর আগের মত খারাপ লাগে না। সামলে নিয়েছি নিজেকে অনেকটা। ঐ ভদ্রলোকের সাথে আর কখনো দেখা হয় নি, কিন্তু উনার দেয়া পুতুলটা রয়ে গেছে। এখন নতুন একটা সম্পর্কেও জড়িয়ে গেছি। পুরানো কিছুর স্মৃতি ধরে রাখার তো আর কোন দরকার নেই। পুড়িয়ে ফেলতে ফেলতে ভাবছিলাম, সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু না, কিছুই ঠিক হয় নি। পরদিন সকালেই বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম যে নিশাত গতকাল রাতেই নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে আত্মহত্যা করেছে।