ট্রেইন জার্নিটা সবসময় উপভোগ্য। তবে সেটা যদি হয় বৃষ্টির সময়, তাহলে তো কথাই নেই। ঝুম বৃষ্টির মাঝ নিয়ে ঝক ঝক ক্ক্রতে করতে আন্তঃনগর ট্রেইন একিটা ছুটে চলছে তার আকাবাকা পথ ধরে দূর দিগন্তে! কপনা করতেও কী সুন্দর লাগছে, তাই না?
সত্যাজিৎ রয় এর পথের পাচালি সিনেমাটা দেখা হয়েছে? ভারতীয় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ একটা সিনেমা, যে সিনেমায় জীবনের গল্প বলা হয়েছে। পৃথিবীর বড় বড় সিনেমা বোদ্ধারা এখনো যেই সিনেমা দেখে অনুপ্রানীত হয়, আমি সেই সিনেমাটার কথাই বলছি। পথের পাঁচালি সিনেমায় ট্রেইনের ছোট একটা দৃশ্য আছে। ট্রেইন দেখার জন্য অপু আর দিদি দূর্গা চলে গিয়েছিল অনেক দূরে৷ সারি সারি কাশফুলের ফাঁক দিয়ে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেইনের ছুটে চলের দৃশ্য থেকে তারা যেমন অবাক হয়েছিল, ঠিক তেমনি আজ এত বছর এসেও সেই সাদাকালো দৃশ্য দেখে আমরা আন্দোলিত হয়। কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি! সে অনুভূতির কথা বুঝিয়ে বলা সম্ভব না।
(Screenshot)
আমার পছন্দের জায়গাগুলোর মাঝে রেল স্টেশন অন্যতম। কারণ বাংলাদেশের প্রতিটা রেলস্টেশন জীবনের গল্প বলে। এই গল্পের চরিত্রের অভাব নেই। নানা ধরনের, নানা শ্রেনীর চরিত্রে ঠাসা এইসব গল্প অবশ্য সবাইকে আন্দোলিত করতে পারে না৷ কারণ জীবন নিয়ে কয়জনই না ভাবে? হ্যাঁ, নিজের জীবন নিয়ে কমবেশি সবাই হয়তো ভাবে৷ কিন্তু নিজের জীবনের বাইরেও যে একটা জীবন আছে, সে বিষয়ে তো আমরা একেবারেই বেখেয়ালল৷ অথচ সেই জীবনের মাঝেই আমাদের বসবাস, কিন্তু উটপাখির মতো বালুতে মুখ গুঁজে নিজেকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকাটাই যেন আমাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।
মানুষ দেখা আমার পছন্দের কাজগুলোর মাঝে একটা। অবসরে আমি মানুষ দেখি, বিশেষ করে তার মুখ৷ একটা মানুষের জীবন কেমন চলছে, সেটা তার অন্যমনষ্ক মুখের দিকে তাকালেই কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়। আমি মাঝে মাঝে এইসব মানুষের মুখ দেখি। তাদের জীবন নিয়ে কল্পনা করার চেষ্টা করি। আমার ভাল লাগে৷ আমি জানি না আমার মতো অন্য কেউ আছে কিনা। যদি থাকতো, তাহলে সে নিজেও হয়তো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার জীবনটা কল্পনা করতো। আর তাকে যদি আমি খুঁজে পেত, তাহলে কাছে গিয়ে জানতে চাইতাম যে সে কী কল্পনা করেছে।
রেলস্টেশন একটা সার্বজনীন স্থান। যেখানে নানা শ্রেণীর, নানা পেশার মানুষ সারাদিন ধরে আনাগোনা করে৷ কেউ বাড়িতে যাচ্ছে, আবার কেউ না বাড়ি ছাড়ছে। কেউ কেউ তো এই রেলস্টেশনকেই তাদের বাড়িঘর বানিয়ে ফেলেছে৷ সব মিলিয়ে প্রায় সব ধরনের মানুষেরই মিলনমেলা এই রেল স্টেশন৷ কিন্তু ট্রেইনের বাড়ি কই?অথচ কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। কেউ কাউকে নিয়ে আগ্রহী না। সবার মুখেই যেন অপেক্ষার ছাপ বিদ্যমান, "কখন আসবে ট্রেইন? আর কতক্ষণ বাকি?"
মাঝে মাঝে জীবনটা খুব ছোট মনে হয়। রেলস্টেশনটাকে যদি একটা পৃথিবীর মতো কল্পনা করি, তাহলে কেমন হয়? আমরা সবাই এর যাত্রী। একেক স্টেশন কারো জন্য গন্তব্যের স্থল, আবার কারো জন্য ছেড়ে যাওয়ার স্থল। কিন্তু ঘুরে ফিরে সবাইকেই তো এই স্টেশনে আসতে হয়। আমাদের জীবনটাও তো প্রায় সেইম৷ কারো জন্য পৃথিবী নতুন, আবার কারো জন্য পুরানো। কেউ মাত্র পৃথিবীতে আসলা, আবার কেউ পৃথিবী ছেড়ে গেল। সবার মিলনমেলা এই পৃথিবী, তাই না?
গত পরশু সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে ভেজার পর থেকে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে আছি। জ্বর নিয়েই গ্রামে গেলাম, আবার জ্বর নিয়েই কুমিল্লায় ফিরলাম। কাল রাতে অবস্থা খুব বেশি খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কোনো মতে রাত পার করলাম। সকালে অবশ্য কিছুটা ভাল অনুভব করছিলাম। কিন্তু আজ সন্ধ্যার পর অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ৷ ঔষুধ খাওয়ার পর কিভাবে যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুম ভাঙ্গলো একদম এগারোটায়। এখন আর চোখে ঘুম আসছে না। শুয়ে শুয়ে নানা আজগুবি গল্প কিংবা কল্পকাহিনী কল্পনা করে যাচ্ছি।
টিভি নাটকে দেখতাম, প্রচন্ড জ্বরে মানুষ আবল তাবল বলে। আমি কখনো এমনটা করেছি কিনা মনে পড়ছে না। তবে আজ আমার মনে হচ্ছে, আমিও একই কাজ করে যাচ্ছি। প্রচন্ড জ্বরের ঘোরে মোবাইলের নোটপ্যাড চালু করে আবল তাবল বকে যাচ্ছি৷ আমার লেখা পড়ে কে কী ভাববে জানি না, তবে জ্বর ভাল হলে নিজের লেখা পড়ে নিজেই হয়তো হেসে দিব। কিন্তু কিছুই করার নেই। প্রতিদিন রাতে লিখতে বসাটা তো অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। এই অভ্যাসটা ছাড়তে পারব না।