১৯৫৮ সালের কথা, চীনে তখন সমাজতন্ত্রের শাসন চলছে। চেয়ারম্যান পদে আছেন কম্যুনিস্টদের অন্যতম নেতা মাও সে তুং। বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান সমাধানে ব্যাস্ত তিনি। তো একবার খেয়াল করলে যে চীনের বেশিরভাগ জায়গায় চড়ুই পাখির সংখ্যা প্রচুর। এসব চড়ুই পাখি ফসলের ক্ষতিও করে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ফসল রক্ষায় সব চড়ুই পাখিকে চীন থেকে বিতারিত করতে হবে। যেই ভাবা, সেই কাজ। খুব জলদি সারা দেশে ফরমান জারি করে দিলেন চড়ুই পাখির বংশ যেভাবেই হোক, চীন থেকে বিতারিত করতে হবে।
চেয়ারম্যানের আদেশ বলে কথা। সারাদেশের সবাই একসাথে মাঠে নামলো চড়ুই দমনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এত এত পাখি হত্যা করা তো সহজ কথা না। এক্ষেত্রে ওরা অস্ত্রের বদলে ঢোল, পিতলের থালা বাসনকে অস্ত্র হিসেবে ইউজ করেছিল। যেখানেই চড়ুর পাখির দেখা পাওয়া যেত, সেখানেই সবাই মিলে ঢোল আর এসব থালা বাসন নিয়ে প্রচন্ড শব্দ করতে করতে ধাওয়া করতো। প্রচন্ড শব্দে ভয় পেয়ে পালিয়ে যেত চড়ুই গুলো। কিন্তু চারপাশে ক্রমাগত ঢোল, ড্রাম আর পিতলের থালার ঝনঝনানির শব্দে ভয়ে হৃদপিন্ড বন্ধ হয়ে মারা যেতে লাগলো একেক করে।
৯৪ লক্ষ বর্গকিলোমিটারের একটি দেশ থেকে রাতারাতি চড়ুই পাখি বিলুপ্ত করে দেয়া এতটাও সহজ ছিল না। কিন্তু সেসময় সবাই যেভাবে গণহারে চড়ুই নিধনে নেমেছিল, তাতে ধারনা করা হয় প্রায় ৬৪ কোটি চড়ুইকে হত্যা করা হয়েছিল সেসময়। খুব সম্ভবত মানুষের হাতে হওয়া সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় হত্যাকান্ড এটিই। রাস্তার মাঝে, ফসলের জমিতে, বাড়ির ছাদে, নদীতে লাখে লাখে মৃত চড়ুই এর দেখা পাওয়া যেত।
চড়ুই নিধনের সবচেয়ে করুণ ঘটনার স্বাক্ষী ছিল বেইজিং এ অবস্থানরত পোলিশ দূতাবাস। শোনা যায় আশেপাশের প্রচন্ড শব্দে ভয় পেয়ে সেখানকার চড়ুইগুলো পোলিশ দূতাবাসের ভেতরে অবস্থান নেয়। পরে মানবিকতার খাতিরে পোলিশ কর্তৃপক্ষ চড়ুই নিধনকারীদের ভেতরে ঢুকতে দেয় নি। কিন্তু চীনা জনগনও ছেড়ে দেয়ার পাত্র না। দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা তারা দূতাবাসের বাইরে বসেই প্রচন্ড আওয়াজ করে যেতে থাকে। ফলে ভেতরে অবস্থান করা চড়ুইও ভয়ে, আতঙ্কিত হয়ে মারা যেতে শুরু করে। কথিত আছে শুধুমাত্র দূতাবাসের ভেতরেই কয়েক হাজার চড়ুর এর মৃতদেহ পড়ে ছিল।
এ থেকেই বুঝা যায় সে সময়ে পুরো চীনে কি পরিমান চড়ুইকে হত্যা করা হয়েছিল। এরকম নির্বোধের মতো আচরণের ফলও চীনা জনগন সাথে সাথেই পেয়ে গিয়েছিল। চড়ুই শুধু শস্য খায়, এমনটা না। তারা ফসলের জমির বিভিন্ন পোকামাকড় খেয়েও ফসলকে সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু সেবার চড়ুই না থাকার কারণে ফসলের উপর পোকামাকড়ের উৎপাত বেড়ে যায়। পঙ্গপাল সহ ফসলের জমি ছেয়ে যেতে থাকে নানা পোকামাকড়ে। যে ফসল বাঁচানোর জন্য এত এত চড়ুই হত্যা করা হয়েছিল, সেই ফসলই নষ্ট হয় পোকামাকড়ের অত্যাচারে। শুরু হয় দূর্ভিক্ষের। দ্যা গ্রেট চাইনিজ ফ্যামিন নামে পরিচিত এই দূর্ভিক্ষে প্রায় দেড় কোটি চীনা মারা গিয়েছিল।
পরবর্তীতে এ থেকে বাঁচার জন্য তৎকালীন চীনা সরকার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে লাখ লাখ চড়ুই আমদানি করে তা পুরো চীনে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়। ধীরে ধীরে এই সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয় তারা।
প্রকৃতির নিজেই নিজের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। এই বিষয়টাকে বলে বাস্তুসংস্থান। এভাবেই প্রকৃতি নিজেকে লাখ লাখ বছর ধরে সুরক্ষিত করে রেখেছে। মানুষ যতবার প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যেতে চেয়েছে, ততোবারই বিপদের মুখে পড়েছে।