ট্রেইনের নাম ঢাকা মেইল। গভীর রাতে ঢাকা চট্টগ্রাম রুটে ছুটে বেড়ায় হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে। সাপ্তাহিক কোনো ছুটির দিন নেই। প্রতিদিন ছুটে চলে আপন গতিতে। এই রুটের মানুষের কাছে সুপরিচিত এক ট্রেইন এটি। সাপ্তাহিক দিনগুলোতে এই ট্রেইনে মানুষে ভরেতি হয়ে থাকে। বিশেষ করে বৃহষ্পতিবার ও শনিবার রাতে। আজ তো কোনো সাপ্তাহিক ছুটির দিন না। তাই তুলনামূলক কম মানুষই ছিল পুরো ট্রেইন জুড়ে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে কুমিল্লা স্টেশনে যখন পৌছে, তখন ঘড়িতে বাজে রাত প্রায় দেড়টা। যেহেতু মেইল ট্রেইন, তাই অনলাইনে এই ট্রেইনের টিকেট পাওয়া যায় না। কাউন্টার থেকে কেটে নিতে হয়, তাও সিট ছাড়া। যদি ট্রেইন ফাঁকা থাকে বা ভাগ্য ভাল হলে মাঝে মাঝে সিট পাওয়া যেতে পারে৷ কিন্তু সেটাও সবসময় না। বেশিরভাগ সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই এই ট্রেইনে জার্নি ক্ক্রার অভিজ্ঞতা আছে আমার।
কাল রাত প্রায় সাড়ে ১২ টার দিকে কুমিল্লা স্টেশনে যাই আমি। উদ্দেশ্য ঢাকা। একটা চাকরির ইন্টারভিউর উদ্দেশ্য ছিল। সেই জন্যই মূলত ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়া দিয়েছি। স্টেশন মোটামুটি ফাঁকা ছিল। দুই একজন মানুষ এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের মাঝে বেশিরভাগই তূর্না নিশিতার যাত্রী। এই ট্রেইনটা আবার আন্তঃনগর ট্রেইন। সার্ভিসও ভাল। যেহেতু অনলাইনেই টিকেট পাওয়া যায় অথবা অগ্রীম টিকেট কাটলে সিট পাওয়া যায়, তাই বেশিরভাগ মানুষ এই ট্রেইনেই যাতায়াত করে৷ ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত আমার হুট করেই নিতে হয়েছিল। তাই টিকেট কাটার সুযোগ হয় নি। তাই নিতান্তই বাধ্য হয়ে ঢাকা মেইলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ আমি জানি যে অউরো রাস্তা দাঁড়িয়েই যেতে হবে। কারণ কয়েক বছর আগেও আমি এই ট্রেইনের নিয়মিত যাত্রী ছিলাম। প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো পরীক্ষা থাকতো৷ আর ঢাকা মেইলে টিকেটের খরচ খুবই কম। তাই টাকা সেইভ করার জন্য এই ট্রেইনটাকেই বেছে নিতাম সবসময়। কিন্তু সময় পাল্টেছে। তাই এখন আর তেমন একটা ঢাকা মেইলে চড়া হয় না।
যায় হোক, স্টেশন প্লার্টফর্মে এদিক সেদিক সবাই হাঁটাহাটি করছে। ঠান্ডাও বেশ ভালই ছিল। দিনের বেলা ঠান্ডাটা তেমন একটা বুঝা না গেলেও এত রাতে ঠিকই কাঁপুনি ধরে যাচ্ছিল। ভাগ্য ভাল ব্যাগে গরম জামা ছিল, সেইটা গায়ে দিয়েই প্লার্টফর্মে বসে বসে ট্রেইনের অপেক্ষা করছিলাম। আর আশেপাশের মানুষ দেখছিলাম। বিচ্ছিন্ন ভাবে এদিক সেদিক কিছু মানুষ ঘুরাঘুরি করছিল। কেউ কেউ ঢাকা মেইলের যাত্রী, আবার কেউবা তুর্না নিশিতার। আবার যাত্রী ছাড়াও কিছু মানুষ আছে, যাদের আমরা ছিন্নমূল বলে ডাকি। উদ্দেশ্যহীন ভাবে এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করছে। হয়তো ঘুমানোর জন্য জায়গা খুঁজছে। ছিন্নমূল মানুষদের জন্য স্টেশনের প্লার্টফর্মই যে বিছানা। যে যেখানে সুযোগ পায়, কাঁথা একটা গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে যায়। কুমিল্লা স্টেশনের প্লার্টফর্মেও এমন মানুষের সংখ্যা কম নেই। চারপাশে এমন কয়েকশো মানুষ ঘুমিয়ে আছে। ট্রেইন আসছে, যাচ্ছে... কিন্তু তাদের ঘুম ভাঙ্গে না। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে এই একটু শান্তির ঘুম, এত সহজে ভাঙ্গে?
আজ অবশ্য দেড়টা বাজার কিছুক্ষণ আগেই ট্রেইন পৌছে গিয়েছে কুমিল্লায়। অন্যসময় লেইট করলেও আজ করে নি। মনে একটু আশা জাগলো এই ভেবে যে ঢাকায় পৌছতেও হয়তো লেইট হবে না। এভাবেই পৌছে যাবো তাড়াতাড়ি। কিন্তু বিধি বাম। যেখানে প্রতিদিন সাড়ে ৬ টার দিকেই ট্রেইন ঢাকা পৌছে যায়, সেখানে আজ প্রায় সাড়ে ৮ টায় ট্রেইন পৌছালো। আর এই পুরো সময়টাতেই ট্রেইনে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিতে হয়েছে আমার।
পুরো রাত ট্রেইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কাটানো হল আজ। ট্রেইনের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখি প্রচন্ড কুয়াশা আর অন্ধকার। ভোর পাঁচটার দিকে একবার কোনো এক স্টেশনে ট্রেইনটা দাঁড়িয়েছিল। প্রচন্ড কুয়াশা আর অন্ধকার মিলে সেই স্টেশন প্লার্টফর্মকে মনে হচ্ছিল ভূতুরে কোনো জায়গা।
ঢাকায় যখন পৌছি, ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গিয়েছিল। আমার ইন্টারভিউ টাইম ছিল এগারোটা। সঠিক সময় ইন্টারভিউর জন্য পৌছাতে পারি নি। প্রচন্ড জ্যামে দেরী হয়ে গিয়েছিল কিছুটা। তবে ইন্টারভিউ বোর্ডে এই দেরি হওয়া নিয়ে তেমন একটা সমস্যা হয় নি। যদিও সারারাত জেগে জেগে ট্রেইন জার্নি করার কারণে অনেকটাই টায়ার্ড ছিলাম, সাথে ছিল মাথা ব্যাথা। সবকিছু মিলিয়ে দিনের বাকি সময় বেশ বাজেই কেটেছে। আগামীকাল আবারও ভাইবা দেয়ার জন্য উপস্থিত থাকতে হবে। যদি ভাইবা ভাল হয়, তাহলে হয়তো ভাল কোনো সংবাদ শুনতে পাবো। সেই পর্যন্ত বিদায়...