বাবা হবার আনন্দ কেমন? বই পুস্তক কিংবা গল্প, কবিতায় মা হবার আনন্দের অনেক সুন্দর সুন্দর বর্ননা পাওয়া যায়৷ কিন্তু বাবা হবার আনন্দটা কেমন? কখনো কোথাও এসম্পর্কে তেমন কোনো লেখা পাই নি আমি। বইয়ের পাতায় বাবাদের দেখানো হয়েছে আবেগহীন এক জাতি হিসেবে, যারা সারাদিন কাজ আর অফিস ছাড়া কিছু বুঝে না। সংসারের কোনো সুখ দুঃখে যাদের কিছু যায় আসে না৷ রোবটের মতো দিন পার করা ছাড়া আর কিছুই নেই তাদের জীবনে। আসলেই কী তাই?
বাবা হবার সুযোগ এখনো হয় নি আমার। হয়তো ভবিষ্যতে হবে। একজন ভাল বাবার কী কী গুনাবলী থাকা প্রয়োজন? গুগলে টুকটাক সার্চ দিচ্ছিলাম সন্ধ্যার পর। মননতো তেমন কোনো লেখা পাই নি৷ তবে একটা ব্লগে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখা পড়েছিলাম। বাবাদের আসলে জোর করে একটা চরিত্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, যেই চরিত্র থেকে উনারা বের হতে পারেন নি কখনো। তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। বিশেষ করে আমাদের সিনিয়র কিংবা আমাদের ব্যাচমেট যারা ইতিমধ্যেই বাবা হয়ে গিয়েছে, তাদের সাথে তাদের সন্তানদের সম্পর্ক খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ, যা আমাদের সময় ছিল না৷
আমার বাবার স্মৃতিগুলো মনে পড়লেই তো অবাক হয়ে যাই। সকাল সন্ধ্যা অফিস করতে করতে কখনো বা রাত হয়ে যেত। কাজ পাগল মানুষটা কাজের ফাঁকে আমাদের সময় দিতে পারতো খুবই কম। সে হিসেবে আমাদের ছোটবেলার পুরোটাই কেটেছে আমাদের মায়ের সাথে। ফলে মায়ের সাথে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা বেশ ভালই ছিল। কিন্তু বাবার সাথে সামান্য দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল।
বাবাকে আমরা যমের মতো ভয় পেতাম। মায়ের হাতে সারাদিন মাইর খেলেও কিছু যায় আসতো না৷ কিন্তু বাবার এক বকাতেই আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যেত৷ ভয়ে কাপাকাপি শুরু হয়ে যেত৷ আর যদি কখনো মাইর দিত, তাহলে তো কথাই নেই। এমন না যে ছোট বেলায় খুব বেশি মাইর খেয়েছি৷ মাঝে মাঝে এক দুইবার হয়তো এমন হয়েছে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো এখনো মনের গহীনে জ্বলজ্বল করে।
তবে সব বাবারাই যে এক, তা কিন্তু না। আমার এক বন্ধুর বাবার সাথে তার খুব ভাল একটা সম্পর্ক ছিল৷ ওদের এত সুন্দর সম্পর্ক দেখে মাঝে মাঝে আমার হিংসেও হতো৷ এসব ছোটবেলার কথা। এখন সুন্দর সম্পর্ক দেখলে ভাল লাগে। আনন্দ হয়। আমার নিজেরও এমন সুন্দর একটা সম্পর্ক তৈরি করতে ইচ্ছে হয়। আল্লাহ হয়তো খুব শীঘ্রই আমার এই ইচ্ছেটা পূরণ করে দিবেন।
তবে এবার বাড়িতে আসার পর আমি কিছুটা নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। আমার বেশ কিছু সিনিয়র কাজিন, যারা ইতিমধ্যেই বিয়ে করে সংসার ধর্মে টিকে আছেন, তাদের বাচ্চা কাচ্চা দেখে যে কেউ নার্ভাস হয়ে যাবে৷ দিন রাত ২৪ ঘন্টা বাড়ির ভেতর চিল্লাচিল্লি৷ আগে বাচ্চাকাচ্চার এসব শব্দ ভাল লাগতো, আনন্দ হতো৷ কিন্তু এবার মনের ভেতর কিছুটা ভয় ঢুকে গিয়েছে। আমার বাচ্চাও যদি এভাবে চিল্লায়, তাহলে সামলাব কিভাবে? বাচ্চা কাচ্চা সামলানো যে কতটা ভয়ংকর ব্যাপার স্যাপার, তা কাছ থেকে না দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না। কোথায় যেন একটা লেখা পড়েছিলাম, মনে পড়ছে না৷ লেখাটা অনেকটা এমন যে, "বাচ্চা কাচ্চা দূর থেকেই সুন্দর, কাছে গেলে বিপদ।" কথাটা শতভাগ সত্যি বলেই আমার মনে হয়।
সুখবর শোনার সাথে সাথেই বাড়িতে একটা হইহই রইরই অবস্থা বিরাজ করছে৷ আমার নিজের ভেতরও যে উত্তেজনা কাজ করছে না, তা কিন্তু না৷ তবে নিজের আনন্দটা যথাসম্ভব সংযত রাখার চেষ্টা করছিলাম সারাদিন ধরে। ঠিক তখনই উপরের কথাগুলো মাথায় চলে এসেছিল। আমি যেহেতু বাবা হতে যাচ্ছি, তাহলে আমি কেন আনন্দ করব না? কেউ আগের যুগের বাবাদের মতো নিজেকে গম্ভীর বানিয়ে রাখতে হবে? আমি তো অভিনয় পারি না। আর যদি পারতামও, তবুও বাস্তব জীবনে নিজেকে অভিনয়ের মঞ্চে নিয়ে যেতাম না।
আমি সবসময় প্রাণ ভরে হাসতে চাই। জীবনকে উপভোগ করতে চাই। প্রিয় মানুষদের সাথে নিজের জীবন কাটাতে চাই। সবাইকে একসাথে পাশে রাখতে চাই৷ ছোট এই জীবনে কী হবে নিজেকে মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রেখে?
তার চেয়ে বরং নিজেকে কিছুটা হলেও বদলানো উচিত। খারাপ ও বাজে স্বভাবগুলো কাটিয়ে উঠা উচিত। কারণ এখন আমি আর আগের মতো একলা না, যেখানে বাউন্ডুলে জীবন কাটাতাম। এখন থেকে আমার সাথে আরো দুইজন মানুষের জীবন ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে৷ আশা করি আমি আমার সমস্ত দায়িত্ব যথাযথ ভাবেই পালন করতে পারব...