ফ্ল্যাশব্যাক ১৯৭৫: বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ও সামরিক শাসনের ইতিহাস।
১৯৭১ সালে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। এর আগে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের সময় এই দেশের মানুষ ভাবছিল স্বাধীনতা আসলেই বুঝি আমরা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারবো। কিন্তু বারবার আমাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। প্রতিবার স্বপ্ন ভঙ্গের পর আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখেছে এই অঞ্চলের মানুষ।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে এসে দেশের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন। তিনি শুধু দায়িত্বই তুলে নেন নি, বরং সাত কোটি মানুষের স্বপ্নকে সত্যি করার সংকল্প নেন। কিন্তু সমস্যা হলো টানা ৯ মাসের যুদ্ধে পুরো বাংলাদেশ তখন একেবারেই বিধ্বস্ত। রাস্তা নাই, ব্রিজ নাই, ব্যাংক নাই, টাকা নাই, কিছুই নাই।
স্বাধীনতা তো এমন কোন ম্যাজিক বাক্স না যে পাওয়া মাত্রই সব সমস্যার সমাধান মুহুর্তের মাঝেই হয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু সবাইকে ধৈর্য ধরতে বললেন। ধীরে ধীরে একটা একটা করে সমস্যার সমাধান করতে লাগলেন।
কিন্তু চুরি, দূর্নীতির লাগাম তিনি কোনো ভাবেই সামলাতে পারছিলেন না। যে যেভাবে পেরেছে, লুটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে সব। তাইতো একদিন কোনো এক সমাবেশে তিনি চরম অসহায়ত্বের সুরে বলেছিলেন, "সবাই পায় তেলের খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।"
তার উপর সদ্য যুদ্ধ শেষ হওয়া একটি দেশের চারদিকে অস্ত্র গোলা বারুদ ছড়িয়ে আছে। সবাইকে অস্ত্র জমা দিতে বলা হলেও অনেকে জমা দেয় নি। ফলে চারদিকে ডাকাতি, খুনখারাবিও বেড়ে গেল। পাপাশাপাশি শ্রেণী শত্রু খতমের নামে বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন মানুষ হত্যা করা শুরু করলো। এধরনের সিচুয়েশন এর আগে দেশ ভাগের সময় ভারতেও দেখা গিয়েছিল। এবার সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশকেও সেইম সিচুয়েশনের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছিল। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস।
যায় হোক, নতুন একটি দেশের শুধু অভ্যন্তরীন উন্নয়নই নয়, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্যেও প্রতিনিয়ত কাজ করতে হচ্ছিল। তবে এক্ষেত্রে দুঃখের বিষয় এই যে পশ্চিমা দেশসমূহ খুব সহজে স্বীকৃতি দিলেও মধপ্রাচ্যের দেশসমূহ আমাদের স্বীকৃতি দিতে চায় নি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বাজে সময় হলো বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রোগ্রামে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ভোর রাতে কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্যে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধুকে তার নিজ বাসভবনেই খুন করে।
১৫ই আগস্টের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য এক কালো রাত। এই রাতেই মূলত বাংলাদেশ আবারও নিকষ কালো অন্ধকারে আবারও ডুবে গিয়েছিল। এরপর চলে টানা অভ্যুত্থান ও পালটা অভ্যুত্থানের ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর সরকার পতনের পর সেনা বাহিনীর সমর্থিত বঙ্গবন্ধুরই সহচর খন্দকার মোশতাককে প্রধান করে আওয়ামিলীগের ২১ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় নতুন মন্ত্রীসভা। মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে না চাওয়ায় গ্রেফতার করা হয় জাতীয় চার নেতাকে।
বাংলাদেশের মীরজাফর খন্দকার মোশতাকের দূর্গে আঘাত করেন সেনাবাহিনীর খালেদ মোশারফ। নিজের রেজিমেন্ট এর সৈন্য নিয়ে বঙ্গভবন ঘেরাও করেন। মুক্তিযুদ্ধের সেনাপ্রধান আতাউল গনি উসমানের সাথে দেনদরবার করে শেষ মুহুর্তে অবশ্য বঙ্গবন্ধুর খুনের সাথে জড়িত থাকা প্রত্যেককে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন।
রক্তপাতহীন এই অভ্যুত্থানের পর সবকিছুর নিয়ন্ত্রন করার পরও খালেদ মোশারফ সরকার ঘঠন করতে পারেন নি। বরং কর্নেল তাহের সিপাহীদের সাথে নিয়ে নতুন বিপ্লবের ডাক দেন। খালেদ মোশারফ সহ সেবানাহিনীর ভেতর তার বহু সৈন্যকে প্রকাশ্যে খুন করা হয়।
খালেদ মোশারফ জিয়াউর রহমানকে বন্দি করলেও কর্নেল তাহের বিপ্লবের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করেন। তবে তাহেরের উপকারের প্রতিদান জিয়াউর রহমান খুব সুন্দর করেই দিয়েছিলেন। বিচারের নামে প্রহসন করে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিয়েছিলেন তিনি।
এরপর দীর্ঘদিন জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিলেন। নিজেকে সেনাপ্রধান থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। তার সময়েই বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে শুরু করে। যদিও জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে অনেক। তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পুরস্কৃত করেছিলেন, পাশাপাশি স্বাধীনতা বিরোধী অনেক দলকে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন।
তার আমলে যে সেনানাহিনীর ভেতর বিদ্রোহ হয় নি, এমনটা না। কিন্তু কঠিন হাতে তিনি সেসব বিদ্রোহকে দমন করেছিলেন। সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী তার শাসন সময়ে তিনি প্রায় ১৪০০ জন আর্মি অফিসার ও সৈনিককে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন।
কিন্তু এত কঠোরতার পরেও শেষ রক্ষা হয় নি। চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে মেজর মঞ্জুরের হাতে তিনি খুন হোন। যদিও খুন করার পর মেজর মঞ্জুর পালিয়ে যান। দেশের ক্ষমতা চলে যায় সেসময়ের প্রধান বিচারপতির হাতে। জিয়ার মৃত্যুতে শোকে মূহ্যমান জাতি আশা করেছিল নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কোনো সরকার আসবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে অস্ত্রের মুখে বিচারপতি থেকে ক্ষমতা নিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে বসে গিয়েছিলেন জেনারেল এরশাদ। জিয়াউর রহমানের মতো এরশাদও দীর্ঘদিন দেশ পরিচালনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার আমলে বাংলাদেশের উন্নতিও হয়েছিল। কিন্তু উন্নতির পাশাপাশি সন্ত্রাস, দূর্নীতির অভিযোগও কম নয়। আর বাঙ্গালী জাতি তো কোনো সেনা সদস্যকে দেশ পরিচালকের দায়িত্বে দেখতে চায় না।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জনগনের অংশগ্রহনে প্রবল আন্দোলনের মুখে এরশাদ ক্ষমতার ইস্তফা নিয়ে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। বহু বছর পর এদেশের মানুষ আবারও ভোট দেয়ার সুযোগ পেল। জনগনের ক্ষমতা নিয়ে ১৯৯০ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এল বিএনপি।
এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ধারা বর্তমান পর্যন্ত বহমান আছে। যদিও আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও সরকারের প্রতি অনেক অভিযোগ আছে, তবে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে কোনো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে ছেড়ে দেয়ার চেয়ে কোনো রাজনৈতি দলের হাতে ছেড়ে দেয়া অনেক বেশি স্বস্তির...
মুক্তিযুদ্ধ ও ৭৫ পরবর্তী প্রেক্ষাপট নিয়ে বহু বই রচিত হয়েছে। তবে আমার পড়া সবচেয়ে পছন্দের বই হলো,
১) তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু কথা।
২) ক্র্যাচের কর্নেল।
৩) বাংলাদেশ: লিগ্যাসি অফ ব্লাড।
বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে যারা জানতে ইচ্ছুক, তারা এই বইগুলো পড়ে দেখতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, কখনোই একটা বই পড়ে ইতিহাসকে জাজ করবেন না।