আমার এক্স এর জেদ বেশিই ছিল। সে যখন যেটা চায়, সেটা হতেই হবে। এর জন্য যতটুকু চিল্লাচিল্লি বা কান্নাকাটি করা যায়, সবকিছুই করবে। যেমন ধরেন কোনো দিন রাতে আমার মাথা ব্যাথা, প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে... এই অবস্থায় যদি বলি যে আমি ঘুমাবো এখন, তখন সে রেগে যেত। তার কথা হলো যে না কথা বলে ঘুমানো যাবে না। এরপর সে কবে, কোন দিন জ্বর নিয়ে, মাথা ব্যাথা নিয়ে আমার সাথে কথা বলেছিল, সব হিস্ট্রি এক এক করে বলা শুরু করে দিত। এইভাবেই ঝগড়া করতে করতে দেখা যেত যে ২-৩ ঘন্টা পার হয়ে গেছে। ঐ সময়গুলোতে আমি ভাবতাম যে শালার রিলেশন না থাকলে আমি যখন ইচ্ছা, তখনই ঘুমাতে পারবো। ঘুমের জন্য এত প্যারা সহ্য করতে হতো না।
আমার ঘুম একটু বেশিই। এই ঘুমের জন্য অনেক ঝামেলা ফেইস করতে হইছে। রিলেশনের শুরুর দিকে আমরা ৫ টাকায় ১০০ এসএমএস কিনে চ্যাট করতাম। একটা মেসেজ পাঠানোর পর রিপ্লাই আসতে প্রায় ২ মিনিট করে সময় লাগতো। রাতে চ্যাট করার সময় এই দুই মিনিটেই আমি ঘুমিয়ে যেতাম। ওদিকে রিপ্লাই না পেয়ে সে কলের পর কল দেয়া শুরু করতো রিসিভ না করা পর্যন্ত। এই কলের প্যারাতে হুট করে ঘুম ভেঙ্গে গেলে এরপর আমার ডিউটি শুরু হয়ে যেত। রাগ আর অভিমান ভাঙানোর ডিউটি। যে ডিউটি লাখ লাখ বছর ধরে পুরুষেরা বিনা বেতনে পালন করে আসতেছে।
ও হ্যাঁ, আমার আরেকটা সমস্যা ছিল। আমার কানে একটু কম শুনি। হেডফোনে ফুল ভলিউমে গান শুনতে শুনতে আজকে আমার এই অবস্থা। এই কানে কম শুনতে পাওয়ার জন্যেও অনেক ঝামেলা হতো। রাতে কথা বলার সময় সে আস্তে আস্তে কথা বললে আমি কিছুই বুঝতে পারতাম না। দেখা যেত যে রোমান্টিক টাইপড কথা বলার সময় সে কোনো কথা একবার, দুইবার, তিনবার এমনকি চারবার বলার পরেও আমি বুঝতে পারতাম না। এরপর রেগেমেগে লাইন কেটে দেয়ার পর আমি কিছুক্ষণ বোকার মতো বসে থেকে এরপর কল-মেসেজ দিয়ে রাগ ভাঙ্গিয়ে আবার কথা বলা শুরু করে দিতাম।
এই সমস্যাগুলার বাইরে আমার একটা বদ অভ্যাস ছিল। প্রচুর পরিমাণে বিড়ি টানতাম। এইটা নিয়ে প্রথম দিকে কিছু না বললেও পরবর্তীতে ঝগড়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। এবং শেষপর্যন্ত "হয় বিড়ি নয়তো সে" টাইপস ব্ল্যাকমেইলের কারনে আমি বেশ কিছুদিনের জন্য বিড়ি ছেড়ে দিয়েছিলাম। কয়েকমাস বিড়ি ছেড়ে থাকার পর এক সন্ধ্যায় বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে "এক টানে কিছু হয় না" টাইপড ফাঁপড় শুনে সেই যে আবার শুরু করেছিলাম, এই ৫-৬ বছরেও সেই নেশা আর ছাড়তে পারি নাই। এবার অবশ্য বিষয়টা এক্স এর কাছ থেকে গোপন করে রেখেছিলাম। তবে এসব জিনিস তো আর গোপন থাকে না। বন্ধুরা বিড়ি খাওয়ার জন্য প্রায়ই মেসেঞ্জারে মেসেজ দিয়ে ডাকতো। এই সমস্ত মেসেজ চোখে পড়া মাত্রই ডিলেট করে দিতাম। যেগুলো ডিলেট করতে পারতাম না, সেগুলো মাঝে মাঝে তার চোখে পড়তো। সারাদিন শুনশান নীরবতার পর রাত হলেই শুরু হতো ঝড়। আর কখনো বিড়ি ধরবো না ধরনের প্রতিজ্ঞা করে তখনকার মতো ঝড় থামাতাম।
যাক, এসব তো গেলো ঝামেলার কথা। এগুলো বাদ দিলে আমাদের রিলেশনের পুরোটা সময় খুব ভালই কাটছিল। অনেক সুন্দর সুন্দর মুহুর্তের স্মৃতি প্রতিনিয়ত মাথার ভেতর ঘুরে বেড়ায়। শীতের সন্ধ্যায় হাতে হাত রেখে চট্টগ্রামের শাহ আমানত ব্রিজের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় হেঁটে বেড়ানো, পতেঙ্গা সমুদ্রে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, ঝুম বৃষ্টিতে হাত ধরে জিইসি মোড়, খুলশির ভেজা পিচে, রমনা-টিএসসিতে হেঁটে বেড়ানো সহ আরো কত কিছু। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা মনে পড়ে, তা হলো প্রচন্ড বৃষ্টিতে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের উপর হাঁটতে হাঁটতে তাকে কয়েক মুহুর্তের জন্য জড়িয়ে ধরার স্মৃতিটুকু।
ব্রেকাপের সময় সে যখন একটার পর একটা দোষ বলে যাচ্ছিল, আমি তখন আকাশ, বাতাস, মহাকাশ ঘুরেও তার কোনো দোষ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমাদের ব্রেকাপের পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকলেও একটা জিনিস আমি কখনোই অস্বীকার করতে পারবো না যে এই মেয়েটা রিলেশনের পুরোটা সময়েই আমার প্রতি ভালোবাসায় কোনো কমতি রাখে নি। আমি কখনোই তার কোন কাজে নাক গলাতাম না, তবুও আমি যেটা অপছন্দ করি, সে সেটা কখনোই করে নি। প্রতিটা কাজ করার আগে আমাকে জানিয়ে করতো। পরীক্ষা দিতে যাবার আগে আমার কাছ থেকে দোয়া নিয়ে নিত। এমনকি ব্রেকাপের পরেও অভ্যাসবশত দোয়া চাওয়ার জন্য আমাকে ফোন দিয়ে ফেলেছিল। আসলে তাকে নিয়ে এতসব কিছু লিখে শেষ করা যাবে না। তাই গল্পটা অসমাপ্তই থেকে গেলো।