হাইস্কুলে থাকাকালীন কমলাকান্তের জবানবন্দী নামের ছোট রম্যগল্প পড়ার সময় কমলাকান্ত চরিত্রটার প্রতি আকর্ষণ হয় নাই, এমন ছাত্র খুঁজে পাওয়া মুশকিল। নিছক হাস্যরসের মাধ্যমে আদালতের কিছু কিছু আনুষ্ঠানিকতাসমূহ যে কতটা অযৌক্তিক, সেগুলো ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে লেখক বঙ্কিমচন্দ্র তার কমলাকান্তের জবানবন্দী গল্পে তুলে ধরেছিলেন। সেসময় জেনেছিলাম এই রম্য গল্পটি কমলাকান্তের দপ্তর নামক বই থেকে সংকলিত করা হয়েছিল। সেই থেকেই এই বইটা পড়ার জন্য আমার মনে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। ইচ্ছে ছিল বইটি কেনার, কিন্তু কিনব কিনব করে আর কেনা হয়ে উঠে নি।
আজ ঘরে ফিরে দেখি এই বইটা ডাইনিং এর উপর রাখা। বইয়ের নাম কমলাকান্ত। নাম পড়েই হাই স্কুলে পড়াকালীন কমলাকান্তের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সাথে মনে পড়ল এই বইটা পড়ার প্রতি কত আগ্রহ ছিল আমার। কিন্তু আজকে সেই সুযোগ পেয়ে গেলাম। এক বসাতেই সবগুলো গল্প পড়ে ফেললাম। কমকান্ত নামের একজন আফিমখোর চরিত্রের মাধ্যমে লেখক তৎকালীন সময়ের সমাজের কিছু ভুল, ভ্রান্তি ব্যাঙ্গাতক ভাবে তুলে ধরেছিলেন। আজ এত বছর পর এসেও সেইসব বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
লেখক বঙ্কিমচন্দ্র আমার খুব পছন্দের একজন ঔপন্যাসিক। যদিও উনার গল্প, উপন্যাসের শব্দচয়নের কারণে পড়তে কিছুটা কঠিন লাগে। কিন্তু বইয়ের পাতা যত সামনে যায়, সবকিছু ততটাই সহজ হয়ে যায়। সেসময়ের বেশিরভাগ ঔপন্যাসিক ও গল্পকারের বেশিরভাগ লেখাই এরকম। পড়তে কিছুটা কঠিন লাগে। শুরুতে আলসেমিও লাগতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই সমস্যাটা দূর হয়ে যায়। বঙ্কিমচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি নজরুল থেকে শুরু করে তৎকালীন সময়ের প্রায় সবার ক্ষেত্রেই একই অভিযোগ করা যেতে পারে। কিন্তু ভাষা তো পরিবর্তনশীল। একেক সময় ভাষার রূপ একেক রকম থাকে৷ এক সময়ে মুখের ভাষা আর লেখার ভাষার মাঝে ছিল বিস্তর ফারাক। বর্তমানে কিন্তু সেই ফারাকটা নেই৷
কমলাকান্ত বইটা আমার ছোট ভাইয়ের। সে যেহেতু বাংলা সাহিত্যের ছাত্র, তাই তার রুমে বাংলা উপন্যাসের অভাব নেই৷ কিছুদিন পর হয়তো তার এসব বইয়ের মালিক আমিই হয়ে যাবো৷ এমনিতেই আমার বুক সেল্ফে বর্তমান বইয়ের সংখ্যা ৪৭ টা হয়ে গিয়েছে৷ ৩ টা থাক পূরণ করতে ১০০ টারও বেশি বই দরকার৷ আশা করি এই বছরের মাঝেই আরো অনেকগুলো বই এর মালিক হয়ে যাবো আমি। আর ছোট ভাইয়ের বইগুলা যদি পেয়েই যাই, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। মুহুর্তের মাঝেই ৩ থাক পূরণ হয়ে যাবে। সাথে হয়তো আরো একটা বুকসেল্ফ কিনে নিয়ে আসা লাগতে পারে।
যায় হোক, কমলাকান্তের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কমলাকান্ত চরিত্রটা ইন্টারেস্টিং। বঙ্কিমচন্দ্রের অসাধারণ এক সৃষ্টিও বলা যেতে পারে৷ এধরনের আরো অনেক চরিত্র আরো অনেক লেখক ও ঔপন্যাসিকও সৃষ্টি করেছিলেন৷ তবে কমলাকান্তের ব্যাপারটা আলাদা৷ অন্যদিকে রম্যলেখক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের ক্ষমতাও অসাধারন। আর সেই ক্ষমতাবলেই কমলাকান্ত চরিত্র ও তার গল্পগুলো আজ এত বছর পর এসেও এতটা প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
প্রাথমিকভাবে কমলাকান্তের গল্পগুলো পড়তে গেলে মনে হতে পারে আজগুবি কিংবা অর্থহীন কিছু কথাবার্তা। সারাদিন আফিম খেয়ে এখানে সেখানে পড়ে থাকা একজন মানুষের কাছ থেকে আর কিইবা আশা করতে পারি। কিন্তু একটু গভীর ভাবে ভাবতে গেলেই বুঝা যাবে যে কমলাকান্তের কথাগুলো আসলে আমাদের না বলা সব কথা, যেগুলো আমরা অনেক কারণেই বলতে পারি না। বা এসব কথা যে বলা যায় বা এসব প্রসঙ্গে যে প্রশ্ন তোলা যায়, সেগুলো আমাদের মাথাতেই আসে নি। কিন্তু কমলাকান্ত এসে আমাদের মন ও বিবেকে সেই আঘাতটা করেছে।
কমলাকান্ত মূলত লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্যোপাধ্যায় শ্রীভীষ্মদেব খোশনবীস নামে লিখেছেন। কমকান্ত নিরুদ্ধেশ হবার আগে শ্রীভীষ্মদেবের কাছে তার দপ্তরখানা উপহার হিসেবে দিয়ে যান। সেই দপ্তরের বিভিন্ন লেখা, চিন্তাভাবনা ও কাহিনী নিয়েই মূলত এই বইটি রচিত হয়েছে।
সময় ও সুযোগ থাকলে এই বইটি অবশ্যই পড়া উচিত।