ইগন্যাজ স্যামেলওয়াইজ: হাত ধোয়ার কথা বলে খুন হয়েছিলেন যিনি।
একটা সময় ছিল যখন হাত ধোয়া এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। হাতের মাধ্যমেও যে জীবানু ছড়াতে পারে, তা অনেকেই বিশ্বাস করতেন না। তবে মজার বিষয় হলো হাত ধোয়ার কথা যিনি প্রথম বলেছিলেন তাঁকে তার সহকর্মীরা পাগল ভেবে পাগলাগারদেই পাঠিয়ে দিয়েছিল।
বলছি উনিশ শতকের কথা। চিকিৎসা বিজ্ঞানে পৃথিবী তখনোও এতটা উন্নত হয়ে উঠে নি। জীবানু সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের খুব বেশি ধারনাও ছিল না তখন। হাসপাতালগুলোকে মনে করা হতো মৃত্যুর ঘর। শুধুমাত্র মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হতো তখন।
এখন অবশ্য হাত ধোয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে করোনা ভাইরাস আসার পর থেকে সহ দেশেই এই প্রতি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে অনেক বেশি। টিভি চ্যানেলগুলোতে কিছুক্ষণ পর পর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনগনকে হাত ধোয়ার ব্যাপারে প্রতিনিয়ত সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অথচ পৃথিবীর ইতিহাসে ভাইরাস থেকে বাঁচতে প্রথম যে ডাক্তার সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কথা বলেছিলেন তাঁকে অন্য ডাক্তাররা পাগলা গারদে পাঠিয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই না, পরবর্তীতে সেখানকার গার্ডরা সেই ডাক্তারকে পিটিয়ে খুন করেছিল। ইতিহাস খুব ভয়ংকর, তাই না?
সময়টা ১৮৪০ সাল। জীবাণু কিভাবে ছড়িয়ে পড়ে, সে সম্পর্কে অনেকেরই ধারনা ছিল না।। হাত ধোয়ার প্রচলন ছিল একেবারেই কম। টয়লেট থেকে এসে, এমনকি ক্লিনিক্যাল প্রসিডিওর কিংবা অপারেশনের আগে ডাক্তাররাও হাত জীবানুমুক্ত করার চেষ্টা করতেন না।
এই বিষয়টা প্রথম নজরে আসে হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক ইগন্যাজ স্যামেল ওয়াইজ এর। ১৮৪৭ সালে তিনি তার হাসপাতালের ডাক্তারদের বলে দেন প্রসূতি বিভাগে গর্ভবতী মায়েদের পরীক্ষা করবার আগে হাত ধুতে হবে এবং তাদের ইনস্ট্রুমেন্ট- গুলি জীবানুমুক্ত করতে হবে। এর ফল হল অসাধারন। সে বছর হাসপাতালের মৃত্যুর হার অনেকাংশেই কমে গেলো।
এমন অসাধারন সাফল্যের পর স্যামেলওয়াইজ হাত ধোয়ার উপকারিতা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। কিন্তু তাঁর সহকারীরা তাঁর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করলেন, কারণ তাদের মনে হল রোগীদের মৃত্যুর জন্য স্যামেলওয়াইজ চিকিৎসকদের দোষারোপ করতে চাচ্ছে। পাশাপাশি ইগোর প্রবলেম তো আছেই। ভিয়েনা হাসপাতালে মৃত্যুহার কমলেও, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও স্যামেলওয়াইজ এর বক্তব্য গ্রহণ করতে চাইলো না।
প্রত্যাখ্যাত হয়ে স্যামেলওয়াইজ হাঙ্গেরিতে ফিরে ১৮৬১ সালে নিজের কাজ প্রকাশ করলেন। কিন্তু এতেও কোনও লাভ হল না। কারণ সায়েন্টিফিক সোসাইটির লোকজন তখনও বিশ্বাস করত রোগ বালাই হয় খারাপ আত্মার মাধ্যমে।
এবার তিনি ব্যাক্তিগত ভাবে কাজ করা শুরু করলেন। ঐ এলাকার সকল ডাক্তারদের চিঠি লিখতে শুরু করেছিলেন যেন সবাই অপারেশন করার আগে তাদের হাত ও ইন্সটুমেন্ট ধুয়ে কাজ করেন। নতুবা রোগের সংক্রামন হতে পারে। মরিয়া স্যামেলওয়াইজের এধরনের কাজকারবার দেখে সেসময়ের অনেকেই তাকে পাগল ভাবা শুরু করলো।
সকলের কাছে হেনস্থা হবার কারণে ধীরে ধীরে তিনি ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হোন। ১৮৬৫ সালের দিকে ডিপ্রেশনের কারনে তার সিচুয়েশন আরো খারাপ হয়ে গেলে ম্যান্টাল এসাইলামে পাঠানো হয়। কেউ কেউ তো বলে বেড়ানো শুরু করেছিল যে স্যামেলওয়াইজের শরীরে খারাপ আত্মা ভর করেছে।
কোনো এক অদ্ভুত কারণে মাত্র ১৪ দিন পর, মেন্টাল এসাইলামের গার্ডরা তাকে পেটালো। পেটানোর মাত্রা এতই বেশি ছিল যে তাঁর হাতে-শরীরে ক্ষত তৈরি হয়। আর সেই ক্ষত খুব অল্প সময়ে পঁচে বিষাক্ত জীবানু তার রক্তে মিশে যায়। যার কারনে রক্তের মাত্র ৪৭ বছর বয়সে ১৩ আগস্ট, ১৮৬৫ সালে মারা যান এই যুগান্ত সৃষ্টিকারী চিকিৎসক।
তার মৃত্যুকে সেসময় কেউই কোনো গুরুত্ব দেয় নি। একজন পাগলের মৃত্যকে গুরুত্ব দেয়ার কি আছে? এভাবেই হয়তো হারিয়ে যেতেন আমাদের এই স্যামেলওয়াইজ। তবে পরবর্তীতে অনেক বছর পর তার তত্ত্ব গ্রহন করেছিল চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। কিন্তু ততোদিনে তিনি পৃথিবী থেকেই বিদায় নিয়েছিলেন।
হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে তাঁর সম্মানে অনেক বড় স্তম্ভও গড়া হয়েছে। আজকের যুগের চিকিৎসা বিজ্ঞান তার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে। সাথে কৃতজ্ঞ থাকবো আমরাও। যুগে যুগে এমন মহৎ মানুষেরাই আমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এনেছিলেন। আমরা তাদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবো।