ফুটবল মাঠের মুকুটহীন সম্রাটের হাতে অবশেষে ধরা দিল বিশ্বকাপ। টানা ৩৬ বছর ধরে অধরা থাকার পর অবশেষে সম্রাট বিশ্ব জয় করে নিয়ে গেলেন বিশ্বকাপ। এই শতকের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বোধহয় এটিই। আর আমরা স্বাক্ষী হিসেবে রয়ে গেলাম এই সুন্দরতম দৃশ্যের। আজ হতে অনেক বছর পর আমরা হয়তো গর্ব করেই বলতে পারবো যে আমরা সেই ম্যাচটা সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম, যেই ম্যাচে সম্রাট মেসি তার দুই হাতে উচু করে ধরেছিলেন বিশ্বকাপ ট্রফিখানা।
Source: internet
তবে এই সফলতা কিন্তু এমনি এমনি ধরা দেয় নি। আজ এত বছর ধরে কত শত বাঁধা পেরিয়ে আজকের এই মঞ্চ তৈরি হয়েছে, সেই গল্প তো আমরা সবাই জানি। ফুটবলের মাঠে সীমাহীন রাজত্ব চালালেও জাতীয় দলের গল্পটা ছিল ভিন্ন। একের পর এক ব্যার্থতার মুখোমুখী হয়ে কতবার যে মুখ থবড়ে পড়তে হয়েছে। হতাশায় বার বার ভেঙ্গে পড়লেও পরের বার আবারও নিজেকে তৈরি করেছেন নতুন ভাবে। এ যেনো ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকা রবার্ট ব্রুসের গল্পটা নতুন ভাবে আবারও লিপিবদ্ধ হয়েছে।
ব্যাক্তিগত ভাবে আমি ব্রাজিলের সাপোর্টার। ফুটবলের প্রতি ভালবাসা তৈরির পেছনে ব্রাজিলের অবদান অনেক। ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী রোনালদো, রোনালদিনহো আর রিভালদোদের নাম শুনে শুনেই ফুটবলের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল আমার। সেসময়ের ম্যাচগুলো সরাসরি দেখার সুযোগ হয় নি আমার। পরবর্তীতে অবশ্য ইউটিউবের কল্যানে সেসব ম্যাচগুলো বহুবার দেখা হয়েছে। বর্তমান ব্রাজিল দলের সাথে সেসময়ের ব্রাজিল দলের কোনো মিলই পাই না আমি। মাঝে মাঝে খুব হতাশ লাগে৷ কিন্তু নিজের প্রিয় দল তো আর বদলানো যায় না।
ব্রাজিল নিয়ে অবশ্য আমার আশাও ছিল না আমার। বিনা আশাতেই তাদের ম্যাচগুলো দেখতে বসতাম। কিন্তু আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলো ছিল যথেষ্ঠ সুন্দর। একের পর এক ম্যাচ দাপটের সাথে জিতে গিয়েছে। ভেবেছিলাম ফ্রান্স হয়তো তাদের আটকাতে পারবে। প্রায় আটকিয়েও দিয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। যদিও ফাইনাল ম্যাচের শুরুর দিকে ফ্রান্স প্রচন্ড বাজে রকমের পারফর্মেন্স করেছে। তবুও শেষ মুহুর্তের দুই গোলে সমতা ফিরিয়ে ফাইনালের শেষটা আমাদের সকলের জন্য উপভোগ্য করে তুলেছিল।
মনে মনে ফ্রান্সের জয় চেয়েছিলাম। কারণ রাইভাল সমর্থক হিসেবে কখনোই চাই নি আর্জেন্টিনা শিরোপা জিতুক। শুধু আমি বা আমরা না, খোদ ব্রাজিলের রোনাল্ডোও কিছুদিন আগে তার এক বক্তব্য দিয়েছিল। যদিও আমাদের সেই আশা পূরন হয় নি। সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ মুহুর্তে বিজয়ের হাসি হাসলো আর্জেন্টিনা ও মেসি।
ফুটবল ইতিহাসে অবশ্যই এটি স্মরনীয় একটি দিন হয়ে থাকবে সকলের কাছে। বিশেষ করে ফাইনালের ৭০ মিনিটের পর থেকে ফ্রান্স-আর্জেন্টিনা যেভাবে এটাক-কাউন্টার এটাক দিয়ে যাচ্ছিল একে অন্যের দিকে, সেইটা সত্যিই অসাধারণ। এধরনের থ্রিলিং ম্যাচের স্বাক্ষী হতে পারাটাও কম কিছু না।
যায় হোক, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ দেখায় মন খারাপ হলেও আর্জেন্টিনার হাতে বিশ্বকাপ দেখতে খারাপ লাগছে না৷ আমার বন্ধুরা অবশ্য নানা ভাবে আমাকে নিয়ে মজা নেয়ার চেষ্টা করছে। মজা নিচ্ছে নিক, সে অধিকার তাদের আছে। আমার কিন্তু মোটেও মন খারাপ হচ্ছে না। বরং এই পুরো ব্যাপারটা আমি ব্যাক্তিগত ভাবে খুব এঞ্জয় করে যাচ্ছি। বাস্তব জীবনে কতশত সমস্যায় একেক জনের জীবন জর্জরিত। সেই জর্জরিত জীবনের মাঝে একটু হলেও যদি আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে সেইটা আনন্দটাকে বাদ দিব কেন?
তবে একটা গত প্রায় ১ দশক ধরে ফুটবল বিশ্বে ফুটবল নিয়ে যে উন্মাদনাটা ছিল, তাতে হয়তো এবার কিছুটা ভাটা পড়বে। যদিও এটা আমার একান্ত ব্যাক্তিগত মতামত। এই মতামতের পেছনে নিজস্ব কিছু ভাবনাও আছে। উদাহরন হিসেবে বললে ক্লাব ফুটবলের কথাই ধরা যাক। একটা সময় ছিল রাতের পর রাত জেগে ক্লাব ফুটবল নিয়ে সময় কাটাতাম। একের পর এক ম্যাচে জয় পরাজয় দেখেছি। বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ রাইভালিরিটি অনেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ব্রাজিল আর্জেন্টিনার মতো। পাশাপাশি মেসি-রোনালদোর দৈরত্ত্ব তো ছিলই। কিন্তু মজার ব্যাপার হল রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ক্লাব ফুটবলের প্রতি অনেকেরই আগ্রহ কমে গিয়েছিল। এবং সেই কমে যাওয়া কফিনের উপর শেষ পেরেক ঠুকেছিল মেসির বার্সেলোনা ত্যাগ। এখন আর ক্লাব ফুটবল নিয়ে তেমন একটা উন্মাদনা নেই। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ক্লাব ফুটবলের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবলেও এভাবেই উন্মাদনায় ভাটা পড়বে...