আজ হুট করে আবহাওয়ার তাপমাত্রা এতই বেশি বেড়ে গিয়েছে যে সহ্য করাই মুশকিল। তার উপর আবার লোডশেডিং। বসে বসে থাকাটাই যেন বিশাল বড় এক কঠিন কাজ হয়ে গেল। একদিকে গক্রম আর অন্যদিকে লোডশেডিং এর অত্যাচার, সব মিলিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় ঘরের ভেতর বসে থাকাও দুষ্কর। তাই বাড়ির পাশের পুকুর ঘাটে এসে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য বের হয়েছিলাম। আর বের হয়েই দেখি এই তিন পিচ্চি রিকশায় বসে নানা রকম কসরৎ দেখাচ্ছে। যদিও ৩ জনের মাঝে ১ জন এখনো ছোট বাচ্চা, বসে বসে বাকি দুইজনের কসরৎ দেখা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই।
দুপুরের দিকে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গিয়েছিল৷ সূর্যের তাপে ঘরের ছাদ যেন আগুনে অউড়ে যাচ্ছিল। ফলে রুমের ভেতর ভ্যাপসা একটা গরম। এধরনের গরম সহ্য হয় না৷ বাইরে তো বিন্দু পরিমান বাতাসও নেই৷ তবুও ঘরের ভেতরের ভ্যাপসা গরমের চেয়ে বাইরের গরমটা অনেক বেশি সহনীয়। তার উপর আবার পুলুর ঘাটে গাছপালার সংখ্যা বেশি থাকায়, সেখানে কিছুটা ছায়া পাওয়া যায়। সেজন্য অন্য যে কোনো স্থানের চেয়ে পুকুর ঘাটের পরিবেশ ও তাপমাত্রাটা কিছুটা আরামের বলেই মনে হল৷
গ্রীষ্ম কাল তো সে কবেই পার হয়ে গিয়েছে। পঞ্জিকা অনুসারে এই সময়টা বর্ষার প্রায় শেষ সময়৷ কিন্তু এবার বৃষ্টি তেমন একটা হয় নি। ছোটবেলায় দেখতাম, বর্ষার সময়ে শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি৷ আর পাহাড়ি ঢলে বেয়ে আসা বন্যার পানি৷ সেসময় সারাক্ষণ সাথে একটা ছাতা থাকতো। আর থাকতো বন্যার ভয়। এখন আর এসব নেই৷ এই বছর ছাতা নিয়ে বাসা থেকে একবারের জন্যেও বের হয়েছি বলে মনে পড়ছে না৷ আর বন্যা? বান্দরবান থেকে চলে আসার পর কখনো বন্যা পরিস্থিতির মুখে পড়ি নি৷
যদিও এবছর ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেটের দিকে বন্যা হয়েছে৷ তবে সেই বন্যা সিলেট ছাড়া আর কোথাও তেমন একটা ছড়িয়ে পড়েছে বলে শুনি নি। এর আগে গত কয়েক বছরে সিলেটে এমন ভয়াবহ বন্যা হয়েছে বলেও আমার জানা নেই৷ ২০০৪ সালের পর বাংলাদেশে আর কখনো ভয়াবহ রকমের বন্যা হয়েছে? সেসময় বাবাকে সবসময় দেখতাম টিভি খুলে বন্যা পরিস্থিতির খবর দেখত৷ আমরা তখন বান্দরবান শহরে ছিলাম৷ অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমি হবার কারণে সেখানে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার মতো কোনো সুযোগ ছিল না৷ তবে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে একবার আমাদের বাড়ির পেছনে পাহাড় ধ্বসে পড়েছিল। ভোর রাতে ভয়ংকর আওয়াজ শুনে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের বাসার রান্নাঘরের প্রায় পুরোটাই মাটির নীচে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। একটুর জন্য আমাদের বেডরুমগুলো বেঁচে গিয়েছিল সেবার।
যায় হোক, অতীত ছেড়ে বর্তমানে ফিরে আসি। তীব্র গরমে সবাই যখন বিপর্যস্ত, তখন পুকুর ঘাটে রিকশায় চড়ে মজা করে যাচ্ছে এই তিন পিচ্চি৷ রিকশার মালিক হয়তো রিকশা এখানে রেখে বাড়িতে গিয়েছে বিশ্রাম নিতে। সেই সুযোগেই মূলত এরা রিকশায় চড়ে বসেছে। চেষ্টা করছে রিকশা চালাতে। যদিও চাকা লক করা৷ চেষ্টা করলেও লাভ হবে না৷ তবে মিথ্যে মিথ্যে রিকশা চালাতে দোষ কী? ছোটবেলায় আমরা তো সোফার সেট দিয়ে বাস বানিয়ে খেলতাম।
ছোট মানুষদের জীবনটাই অন্যরকম৷ বাস্তব দুনিয়া সম্পর্কে তাদের কোনো ধারনাই নেই৷ নিজের কাছে যা আছে, তাতেই সন্তুষ্ট তারা। তারা খুব সুন্দর করেই তাদের দিনটা হেসে খেলে কাটিয়ে দিতে পারে৷ কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিন্তু সেই আবেগ অনুভূতিগুলোও কমতে থাকে। এভাবে কমতে কমবে একসময় হারিয়ে যায়। অনেক বছর পর হুট হাট সেসব ছোটবেলার স্মৃতি কিংবা গল্পগুলো মনে পড়লে ভালই লাগে৷ মনের ভেতর অদ্ভুত ভাল লাগা কাজ করে৷
আজ দুপুরে কুমিল্লার তাপমাত্রা ছিল অলমোস্ট ৩৪, যেখানে বিকেলে কমে সেটা হয় ৩২। দিন শেষ হওয়ার পাশাপাশি তামপাত্রাও কমবে, তা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হুট করে কোত্থেকে যেন পুরো আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল৷ চারপাশে তুমুল হাওয়া। অনেকটা কালবৈশাখীর মতো। কিন্তু এখন তো কালবৈশাখী হবার কথা না!
কিছু বুঝে উঠার আগেই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি শুরু হল। এ যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তির বৃষ্টি। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। এক দৌড়ে বাইরে চলে গেলাম বৃষ্টিতে ভিজতে৷ এমনিতেই সারাদিন ঘরে বাইরে তীব্র গরমে প্রান উষ্ঠাগত। এমতাবস্থায় বৃষ্টির পানি গায়ে লাগা মাত্রই অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করলাম৷ প্রায় আধঘন্টার মতো উঠানে হেঁটে হেঁটে বৃষ্টিতে ভিজলাম। ঘর থেকে মা একটু পর পর এসে ডাক দিয়ে যাচ্ছিল৷ বার বার বলছিল বৃষ্টিতে না ভেজার জন্য৷ কিন্তু কে শুনে কার কথা?
তবে বৃষ্টিতে ভিজে যে নিজেই নিজের শরীরের উপর অত্যাচার করেছি, তা বুঝতে পেরেছি কিছুক্ষণ পর৷ এমনিতেই বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা অনেকটা কমে গিয়েছিল। তার উপর আবার বৃষ্টিতে ভেজার কারণে খুব শীতও লাগছিল। গোসল করে বিছানায় বসার পর শীতে কাঁপন ধরে গিয়েছিল৷ প্রথমে ভেবেছিলাম একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে৷ কিন্তু না, হয় নি৷ বরং কপালে হাত দিয়ে দেখি উলটো শরীরের তামমাত্রাই বেড়ে যাচ্ছে৷ অর্থাৎ জ্বর উঠতে যাচ্ছে। পাশাপাশি তীব্র মাথা ব্যাথা তো আছেই। জানি না, রাতটা কিভাবে পার হতে যাচ্ছে...