একসময় প্রতি এলাকাতেই শিশুপার্ক থাকতো। শিশুরা যেখানে গিয়ে নিজেদের মতো খেলাধূলা করতো। এখন আর শিশুপার্ক চোখে পড়ে না। পড়লেও সেগুলো নামমাত্র শিশুপার্ক। ভাঙ্গা সব রাইডের চারপাশে ঝোপঝাড় কিংবা আগাছায় ভরে আছে৷ মনে হয় যেন পরিত্যাক্ত কোনো এলাকা। সেগুলো সংস্কারের কোনো নজির চোখে পড়ে না। শিশুদের সুন্দর কিছু সময় কাটানোর জন্য আমরা কোনো কিছুরই ব্যাবস্থা রাখি নি৷ তাহলে তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ হবে কিভাবে?
কুমিল্লায় শিশুপার্ক নামে একসময় ছিল কয়েকটা দোলনা সহ ঘন ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ একটা এলাকা। সেখানে শিশুদের যাওয়ার মতো কোনো পরিবেশই ছিল না। ধীরে ধীরে সিটি কর্পোরেশন সেইটার সংস্কার করেছে। অনেকগুলো রাইড স্থাপন করেছে৷ যদিও দোলনা ছাড়া এসবের কোনোটাই ফ্রি না। প্রতিটি রাইডের মূল্য জনপ্রতি ৩০ টাকা, সময় ২ মিনিটেরও কম। তবে মূল্য আর সময় যেমনই হোক না কেন, কিছু একটা তো অন্তত আছে ছোট ছোট বাচ্চাদের আনন্দ দেয়ার মতো, তাই না?
কুমিল্লা শহরের ভেতর ধর্মসাগরের পাশেই এই শিশুপার্কটির অবস্থান। গত কয়েক বছরে এই পার্কের অনেক সংস্কার করা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আজ এত বছর পর এসে খুব সুন্দর একটা রূপ ধারন করেছে। বাচ্চাদের নিয়ে যখন পার্কে যাই, তখন খুব সুন্দর একটা অনুভূতির তৈরি হয়৷ বাচ্চাদের আনন্দ, উৎসাহ দেখে নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। ছোটবেলায় আমিও এসব রাইড দেখে খুব আনন্দিত হতাম।
যতটুকু মনে পরে, বান্দরবান যখন ছিলাম, তখন আমাদের কোয়ার্টারের পাশে ছোট একটা শিশুপার্ক ছিল। ছোটবেলায় আমরা সেখানে গিয়ে খেলতাম। আশেপাশের অন্যান্য স্টাফ কোয়ার্টারের বাচ্চারাও এখানে খেলতে আসতো। অনেক রকমের রাইডার ছিল। যদিও সব বাচ্চাদের।
একটু বড় যখন হলাম, তখন রাইডারগুলোতে চড়ার বদলে আমরা ক্রিকেট খেলতাম। ক্রিকেট খেলার মতো খুব বড় স্পেস অবশ্য সেখানে ছিল না। শর্ট পিচ খেলতাম। নির্দিষ্ট একটা দাগ দেয়া থাকতো। বল উড়ে সেই দাগের বাইরে চলে গেলে আউট আর গড়িয়ে গেলে চার৷ সিংগেল বা ডাবল ছিল না৷ এই খেলাটা আমার প্রিয় ছিল। কষ্ট কম হত।
এখন তো বড় হয়ে গিয়েছি। শিশুপার্ক দিয়ে আমাদের আর কোনো কাজ নেই৷ তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তো তৈরি হচ্ছে। ছোট বেলায় আমরা যেমন সুযোগ সুবিধা পেয়েছিলাম, তাদের ক্ষেত্রে তো সেই সুযোগটা হচ্ছে না। অনেক দিক দিয়েই বঞ্চিত তারা৷ মোবাইল, টিভি আর কম্পিউটারেই আটকে আছে তাদের জীবন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। আজকে হয়তো আমরা সেটা বুঝতে পারছি না৷ কিন্তু ভবিষ্যতে এই বিষয়ের জন্য আমাদের ঠিকই ভোগতে হবে৷
ঁকযায় হোক, আজ কাজিনের ছেলে মেয়ে নিয়ে শিশুপার্কে গিয়েছিলাম বিকেলের পর। যদিও আগে থেকে কোনো প্ল্যান ছিল না। হুট করে যাওয়া আর কি। উনারা আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিল। সকাল থেকে যদিও আমি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করে কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম। কিন্তু ছোট দুই বাচ্চারা বাইরে যাবার জন্য কান্নাকাটি করছিল। তো কী আর করার, সবাইকে নিয়ে শিশুপার্কে চলে গেলাম।
আমার কাজিন এবং উনার হাজবেন্ড দুইজনেই চাকরি করেন৷ পেশায় অধ্যাপক। সারাদিন ক্লাস আর প্রাইভেট পড়িয়ে সময় হয় না বাচ্চাদের নিয়ে একটু এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানোর৷ সারাদিন মোবাইল আর টিভি নিয়েই ওদের সময় কাটে। কিন্তু আজ আমাদের সাথে শিশুপার্ক যাওয়ার সুযোগ পেয়ে ওদের আনন্দ যেন আর ধরেই না। পার্কে যাওয়ার পর ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেল৷ কোথাও স্থির ভাবে বসানো সম্ভব হচ্ছিল নাম শুধু দৌড় আর দৌড়। পাশাপাশি সমবয়সী আরো অনেক বাচ্চা কাচ্চা ছিল সেখানে৷ তাদের সাথেও খেলা করা শুরু করে দিয়েছিল।
একটা জিনিস অবশ্য খারাপ লেগেছিল। বাচ্চাদের জন্য বানানো দোলনায় কিছু পূর্ণবয়স্ক ছেলে মেয়ে উঠে বসে ছিল৷ একজনকে রিকুয়েস্ট করেছিলাম কিছুক্ষণের জন্য দোলনাটা ছেড়ে দিতে। যেন আমার সাথে থাকা বাচ্চারা কিছুটা সময়ের জন্য হলেও দোলনায় চড়তে পারে৷ তারা খুব আবদার করছিল দোলনায় চড়ার জন্য৷ কিন্তু তারা দোলনা ছেড়ে দেয় নি।
দোলনার দুঃখ ভুলানোর জন্য তাদের নিয়ে বেশ কিছু রাইডে চড়েছিলাম৷ রাইডগুলো যে আহামরি উন্নত, তেমনও না। তবে বাচ্চাদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য বেস্ট। এর চেয়ে ভাল অপশন তো শহরের ভেতর নেই৷ কুমিল্লার কোটবাড়ির দিকে অবশ্য ম্যাজিক প্যারাডাইস, ব্লু ওয়াটার পার্ক, ডাইনোসর থিম পার্ক আছে। সেগুলো আরো বেশি উন্নত ও সুন্দর। পাশাপাশি খরচও বেশি৷ সবকিছু মিলিয়ে কুমিল্লা শিশুপার্কটাই আমাদের জন্য বেস্ট৷
যায় হোক, সবকিছু মিলিয়ে বেশ ভাল একটা দিন কেটেছে। সাথে ক্লান্তিকরও। কিন্তু দিন শেষে পছন্দের মানুষদের মুখে হাসি দেখে সব কষ্ট ভুলতে পারি আমি। সুযোগ থাকলে কাল কোটবাড়ির দিকে যাবো৷ সেই গল্প নাহয় কাল করব। আজকের মতো বিদায়...