বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,
কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।
কবি রজনীকান্ত সেনের এই ছড়াটি ছোটবেলায় পড়ে নি, এমন কেউ সম্ভবত নেই এই বাংলাদেশে৷ ছড়ার মাধ্যমে গল্পটিতে একটা বাবুই পাখি ও একটা চড়ুই পাখির কথাবার্তাকে তুলে ধরা হয়েছে। বাবুই পাখি যেখানে নিজের মতো করে গাছের ডালে ঘর বানিয়ে থাকে, সেখানে চড়ুই পাখি অন্যের বাড়ির অব্যাবহৃত স্থানে বাসা বানিয়ে থাকে। ঝড়, বাদলা কিংবা যে কোনো অরাকৃতিক বিপর্যয়ে বাবুই পাখিকে কষ্ট আওহ্য করতে হয়৷ অন্যদিকে চড়ুই পাখিকে সেসব কোনো বিপর্যয় ফেইস করতে হয় না। আর সেজন্যই হয়তো চটুই এর মনে কিঞ্চিৎ হলেও অহংকার তৈরি হয়েছিল।
সেকারণেই কোনো এক ভরদুপুরে পৃথিবী যখল অলস নিদ্রায় ব্যাস্ত, তখন চড়ুই পাখি বাবুইকে ডেকে বুঝাতে চেষ্টা করছিল যে বাবুই এর তুলনায় চড়ুই নিজে কত আরামে আছে। কিন্তু বাবুই পাখির অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই৷ ঝড় বাদলের রাতে কিংবা গ্রীষ্মের তপ্ত গরমে নিজ বাসায় থাকতে হয়তো কিছুটা কষ্ট হয়৷ কিন্তু কষ্ট করে বানানো একান্তই নিজের বাসায় থাকার যে আনন্দ, তাতেই সে অনেক খুশি৷ সেকারণেই সে চড়ুই এর বিদ্রুপ কানে তুলে নি বাবুই পাখিটা৷
কবি রজনীকান্ত ছড়ার মাধ্যমে সমাজের ছোট কিছু চিত্র রূপক অর্থে তুলে ধরেছিলেন৷ ছোটবেলায় কবিতা পড়ার সময় অবশ্য এসব রূপক বিষয়গুলো বুঝতাম না৷ পুরো কবিতা পড়ে একটা জিনিসই শুধু শিখেছিলাম, আর তা হল যে বাবুই ও চড়ুই পাখি মানুষের মতো করে কথা বলতে পারে৷ এর আগে অবশ্য ভাবতাম যে শুধুমাত্র ময়না ও টিয়া পাখিই মানুষের মতো কথা বলতে পারে৷
যায় হোক, নিজের পরিশ্রমের উপার্জিত অর্থ সম্পদ আর অন্যের দানে পাওয়া অর্থ সম্পদের মূল্য এক না৷ দুইটা অবশ্যই আলাদা৷ পাশাপাশি অনেকে আবার অর্থমোহে অন্ধ হয়ে সকলের প্রতি বিদ্রুপাত্মক ভাব মনে মনে পোষণ করে৷ অহংকার বশত তারা অন্যদের প্রতি প্রকাশ্যেই বিদ্রুপ করতে পছন্দ করেন৷ উপরের কবিতায় মূলত এই বিষয়গুলোই তুলে ধরা হয়েছে।
কথায় আছে, টাকা দিয়ে সুখ কিনতে পাওয়া যায় না৷ কথাটা সত্য, তবে পুরোপুরি না৷ অভাবের কষ্ট যে সবচেয়ে কঠিন কষ্ট, এইটা যে কখনো ফেইস করে নি, সে বুঝবেও না৷ তবে এতটুকু সত্য যে শুধুমাত্র অর্থ দিয়েই সুখ খুঁজে পাওয়া সম্ভব না৷ সুখের জন্য দরকার মানসিকতা। নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও ভালবাসার মানুষদের নিয়ে একান্তে জীবন যাপন করতে পারলে যে সুখ পাওয়া যায়, তা আর অন্য কিছুতে পাওয়া যায় না৷
গত বছর ওয়াসির কবিরের একটা ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। একজন সুখী মানুষের ছবি৷ সামান্য আয়ে নিজের পরিবার নিয়ে খুব সুখে শান্তিতেই বসবাস তার৷ নেই কোনো বড় চাহিদা৷ সামর্থ্যের মাঝেই যতটুকু সম্ভব ততটুকু চাহিদা পূরণ করে বেশ খুশি তিনি৷ মুখের সারাক্ষণ যেন প্রশান্তির এক হাসি লেগেই আছে৷ আমি মাঝে মাঝে এই লোকটির হাসির দিকে তাকিয়ে থাকি, ভাল লাগে৷ ময়লা শার্ট, আর গামছা পরা, এক হাসে বাজারের ব্যাগ আর অন্য হাতে মাছ নিয়ে কী অদ্ভুত সুন্দর ভঙ্গীমায় দাঁড়িয়ে আছে লোকটি। হিংসে হওয়ার মতো না?
ছোটবেলায় সুখী মানুষের সন্ধ্যানে গল্পটা পড়া হয়েছে কখনো? রাজার মনে অশান্তি, সুখ নেই৷ দেশ, বিদেশের কত শত ডাক্তার এলেন, গেলেন, চিকিৎসা করলেন। কিন্তু কোনোভাবেই যেন রাজার মনের এই অসুখ ঠিক করা গেল না৷ শেষ পর্যন্ত একজন কবিরাজ এসে বললেন, কোনো এক সুখী মানুষের পরনের জামা নিয়ে এসে রাজার গায়ে পরালেই এই অসুখ ভাল হবে৷ সবাই মিলে সুখী মানুষের সন্ধানে নেমে গেল। কিন্তু কোথায় সেই সুখী মানুষ? সবাই তো অসুখী! অনেক খোজাখুজির পর অবশেষে এক সুখী মানুষের সন্ধান পাওয়া গেল। কিন্তু সেই সুখী মানুষের গায়ে কোনো জামা ছিল না৷
ইউরোপবাসী একটা সময় খুব মানসিক অশান্তিতে দিন যাপন করতো৷ সেসময়টাকে বলা হয় দ্যা গ্রেট ডিপেশন টাইম। চাই, চাই, আরো বেশি চাই৷ সবাই পাগলের মতো অর্থ বিত্তের দিকে ছুটতে শুরু করেছিল। পরিবার, পরিজন বাদ দিতে সারাক্ষণ শুধু কাজ আর কাজ৷ সবার মুখে হাসি, কিন্তু অন্যরে টাকার ক্ষুধা৷ এই ক্ষুধা নিয়ে বাঁচা সম্ভব? খাবারের ক্ষুধা বেশিক্ষণ থাকে না৷ অল্প খেলেই ক্ষুধা দূর হয়ে যায়৷ কিন্তু টাকার ক্ষুধা? এই ক্ষুধা কখনো শেষ হবার না৷ তবুও একটা সময় পর ইউরোপিবাসী সেই খারাপ সময় থেকে বের হয়ে এসে জীবনকে আবারও নতুন করে উপভোগ করতে শিখেছে।
মাঝে মাঝে মনে হয় বর্তমানে আমরা বাংলাদেশিরাও এরকম এক সময় পার করছি। মুখে সবাই ভাল আছি, কিন্তু অন্তরের দিক দিয়ে কেউ ভাল নেই৷ সবাই অর্থের পেছনে ছুটছি। কাজ, কাজ আর কাজ৷ পরিবারের সুখের জন্য কাজ করতে করতে কখন যে সময়গুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে, টেরই পাচ্ছি না৷ কিন্তু একদিন না একদিন তো থামতেই হবে, তাই না? কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, যেদিন থামব, সেদিন চারপাশে তাকিয়ে দেখব সুখের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই৷ সবাই হারিয়ে গিয়েছে৷
যায় হোক, জীবনের বেঁচে থাকার একমাত্র মাধ্যম সুখ৷ একেক জনের কাছে সুখের ডেফিনেশন একেক রকম। আমার কাছে সুখ মানে ভিন্ন কিছু। আমার নিজেকে সবসময় সুখী মানুষই মনে হয়। শত খারাপ সময়ের মাঝেও আমি নিজেকে সুখী মানুষ হিসেবে ভাবতেই পছন্দ করি। আমার বিশেষ কোনো চাহিদা নেই৷ আমি শুধু আমার পরিবারের সবার সাথে সুন্দর করে সময় কাটাতে চাই৷ এই সুযোগটি আমি পেয়েছি। আমার আর বেশি কিছু লাগে না।