গল্পটা ১৮৮৬ সালের। আমেরিকা তখন আজকের মতো এত উন্নত দেশ ছিল না। পশ্চিমে তখন সবেমাত্র শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছে। শিল্প বিপ্লবের জন্য বেড়েছে শিল্প কারখানা। সেসব কারখানা চালানোর জন্য দরকার প্রচুর শ্রমিক। আমেরিকার প্রত্যন্ত সব অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ শহরগুলোতে কাজের আশায় ভীড় জমাতে শুরু করে। প্রয়োজনের তুলনায় শহরগুলোতে তখন অতিরিক্ত মানুষ একটা কাজের আশায় এক কারখানা থেকে অন্য কারখানার দরজায় ঘুরে বেড়াতো।
শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কোনো নীতিমালা তখনো তৈরি হয় নি। কিছুদিন আগে মাত্র ক্রীতদাস প্রথা আইন করে বাতিল হয়েছে। কিন্তু কয়েকশো বছর ধরে যে প্রথার চর্চা তারা করে আসছে, তা কি কাগজ কলমের সামান্য খোচাতে এত সহজে হারিয়ে যাবে?
কাগজে কলমে ক্রীতদাস প্রথা হারিয়ে গেলেও মানুষের মন থেকে তো আর এই জঘন্য প্রথা হারিয়ে যায় নি। আর সেজন্যই সদ্য গজিয়ে উঠা আমেরিকার সব কলকারখানাগুলোতে মালিকেরা ইচ্ছে মতো তাদের শ্রমিকদের শ্রম ব্যাবহার করতো। প্রতিদিন ১২-১৬ ঘন্টা ডিউটি করতে হতো এসব শ্রমিকদের। আর বিনিময়ে খুব অল্প পরিমান বেতন হিসেবে পেত।
মালিকপক্ষের এতসব অন্যায্য বিষয়গুলো শ্রমিকরাও মুখ বোঝে সহ্য করে নিয়েছিল। কারণ গোলামির শত বছরের অভ্যাস এত সহজে কি যায়? যায় না হয়তো!
কিন্তু ১৮৮৬ সালের পয়লা মে সকালবেলায় শিকাগোতে এক ভিন্ন চিত্র দেখা গেল। হে মার্কেটের কিছু শ্রমিক রাস্তার পাশে হুট করে জড়ো হয়েছিল। তাদের চোখে মুখে ছিল ক্লান্তি, হতাশার পাশাপাশি ক্রোধের স্পষ্ট ছাপ। জীবন যুদ্ধে কোনো ভাবে নিজেদের টিকিয়ে রাখা শ্রমিকরা যে এরকম হুট করে জ্বলে উঠতে পারে, সে ধারনা তখনোও হয়তো কেউ করতে পারে নি। কিন্তু এইসব শ্রমিকেরা সেদিন জড়ো হয়েছিল কেন? তারা কী চেয়েছিল?
নাহ, তারা বেশি কিছু চায় নি। এসব মানুষদের চাহিদা খুব সামান্য। প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘন্টা একটানা কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। সময়টা কমিয়ে আনতে হবে। এখন থেকে আর সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে এত লম্বা সময় কেউ শ্রম দিবে না। প্রতিদিন ৮ ঘন্টার বেশি কাউকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না। এই তো ছিল তাদের চাওয়া!
কিন্তু তৎকালীন প্রশাসনের হয়তো শ্রমিকদের এই বাড়াবাড়ি পছন্দ হয় নি। পছন্দ না হওয়ারই তো কথা। যুগে যুগে এইসব প্রশাসন সবসময় ক্যাপিটালিস্টদের আজ্ঞাবহ দাস হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে এসেছে। সেহেতু শ্রমিকদের আন্দোলনকে তারা ক্যাপিটালিস্টদের ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখতে পায় এবং আন্দোলন নষ্ট করতে বাছ বিচার না করে গুলি ছুড়ে। ফলে একসময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মাঝে সংঘর্ষ হয় এবং ১০-১২ জন মারা যায়।
এইটা যে সময়ের ঘটনা, আমেরিকা তখন আজকের মতো এত উন্নত ছিল না। আজকের দিনে তো আমেরিকায় শ্রমিকদের আন্দোলন করার দরকারই পড়ে না। আর যদি কোনো কারণে রাস্তায় নামতেও হয়, সেক্ষেত্র পুলিশ ভুলেও এইসব আন্দোলন কিংবা মিছিলে গুলি চালানোর সাহস করবে না।
কিন্তু আমাদের দেশের মতো দেশের জন্য বিষয়টা এমন থাকবে না। কিছুদিন আগেও চট্টগ্রামের কোথাও ন্যায্য দাবী আদায় করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিহত হয়েছিল পুলিশের গুলিতে। অর্থাৎ দুইশো বছর আগের আমেরিকা এবং বর্তমান বা বাংলাদেশের মধ্যে এই বিষয়ে তেমন কোনো পার্থক্যই নেই বলে আমার মনে হয়।
যায় হোক, সে দিনটিকে কেন্দ্র করেই আজকে সারা পৃথিবীতে পয়লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করে। দিনটিকে কেন্দ্র করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রচুর প্রোগ্রাম, টকশো অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চসরে মে দিবস সফল হোক বলে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান।
কিন্তু মজার বিষয় হলো যিনি মে দিবস সফল হোক বলে বক্তৃতা শেষ করেন কিংবা যেসব শ্রোতারা তার সামনে বসে কেতাবি বক্তব্য সমূহ শুনে যাচ্ছে, তাদের কারোরই মে দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে সঠিক ধারনা নেই। একদল বলার কথা, তাই বলে যাচ্ছে। আরবকদল শোনার কথা, তাই শুনে যাচ্ছে। এর বাইরে এই একটা দিন ছাড়া বছরের বাকি দিনগুলোতে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কেউ কিছু বলে না, এমনকি ভাবেও না।