দেশের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বন মধুপুর শালবন আজ চরম বিপন্ন দশায় পতিত হয়ে কাগজের বনে পরিনত হচ্ছে। রাজনৈতিক দুর্বাত্তায়ন ও স্থানীয় নৃ-জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গারোদের সরকারি জমিতে জমিদারি মনোভাবের ফলে এ বনের মোট পাঁচ ভাগের চার ভাগই উজাড় হয়ে গেছে।
যেসব কারণে এই বৃহত্তর বন উজাড় হচ্ছে তার মধ্যে অবৈধ করাতকল অন্যতম। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় বনের বুকে গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ করাতকল। অভিযোগ উঠেছে, এতে স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগ কখনো দুর্বৃত্তদের সহায়তা করে থাকে, কখনো বা রহস্যজনক কারণে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে থাকে।
বন এলাকার বিভিন্ন স্থানে ব্যঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ করাতকল। রাতের আধারে বন উজাড় করে এই অবৈধ করাতকলেই চিড়াই করে হজম করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সরোয়ার আলম খান আবুর যোগসাজশে অবৈধ করাতকলের মালিকরা নির্বিঘ্নে তাদের মিল চালিয়ে যাচ্ছে। করাতকলের মালিকরা সমিতির মাধ্যমে বছরে কয়েক মোটা অঙ্কের টাকা তুলে দিচ্ছেন ঐ নেতার পকেটে। কবে করাতকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো.আবু এসহাক জানান বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে কিছু চাঁদা তুলে দেই তাকে।
বন এলাকার মধ্যে কোন প্রকার করাতকল না থাকার কথা থাকলেও উপজেলার চারটি বিটে শতাধিক করাতকল চোখে পড়বে। শুধুমাত্র মহিষমারা বিটের মধ্যেই রয়েছে ৩৯টি কলাতকল। এই বিটের শালিকা বাজারে ৪টি,গারোবাজারে ৬টি,জয়নাতলী বাজারে ৪টি,চাপড়ি বাজারে ২টি,নেদুর বাজারে ৩টি,মোটেরবাজারে ৬টি করাতকল রয়েছে।শালিকা বাজারের করাতকল মালিক মোতালেব হোসেন,মিস্টার আলী ও আমজাদ আলী পৃথকভাবে জানান,বন কর্মকর্তা ও নেতাদের টাকা-পয়সা দিয়ে মিল চালাতে হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন করাককল মিস্ত্রী জানান,প্রতি মাসে বিট অফিসারকে টাকা দিতে হয়।
কুড়ালিয়া বাজারের সোহেল রানা স্থানীয় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউুনয়ন আওয়ামীগের সভাপতি আহম্মদ আলীকে টাকা দিয়ে অবৈধভাবে সোহেল স’মিলে নামে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন। অবৈধ করাতকলকে ইউনিয়ন পরিয়দ ট্রেড লাইসেন্স দিতে পারে কিনা জানতে চাইলে কুড়ালিয়া ইউপি সচিব মো.আনোয়ার হোসেন জানান,অবৈধ ব্যবসাকে লাইসেন্স দেয়ার নিয়ম নেই। তিনি জানান,এমনটি হয়েছে কিনা খোঁজ নিয়ে দেখব।
মহিষমারা বিট কর্মকর্তা সুজাত আলীকে মিলপ্রতি ২ হাজার টাকা মাসোয়ারা দিতে হয় বলে সংশ্লিষ্ট অনেকেই জানিয়েছেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে মহিষমারা বিট কর্মকর্তা সুজাত আলী জানান,মিল চালাতে নিষেধ করি বলে মালিকরা মিথ্যে অভিযোগ করেছেন।
জয়নাতলী বাজারের মিল মালিক মো.নজরুল ইসলাম জানান,আমাদের মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু এসহাক উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার আলম খানের নাতি হয়।
মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু এসহাক সত্যতা স্বীকার করে জানান,স্থানীয় এম.পি এবং ইউএনও একবার করাতকল বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেননি।
চাড়ালজানি বিট কর্মকর্তা মো.আনিছুর রহমান অবৈধ করাতকল বন্ধ না করার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানান,একবার ৫টি করাতকলের চাকা খুলে আনলে স্থানীয় নেতারদের নিকট অনেকটা লাঞ্ছিতও হয়েছি।
সহকারি বন কর্মকর্তা (এসিএফ) এম.এ হাসান জানান,আমরা বনের ভিতর অবৈধ করাতকল বন্ধের চেষ্টা করছি। উপজেলার প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে অচিরেই একটি ব্যবস্থা নেব।
মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস জানান,স্থানীয় নেতৃবৃন্দ সজাগ না হলে প্রশাসনের একার পক্ষে বন রক্ষা করা যাবে না। তিনি জানান এসিএফের সাথে আলোচনা করে দেখব কিভাবে এই ঐতিহ্যবাহী বনকে রক্ষা করা যায়।
টাঙ্গাইলটাইমস