একদিন সবটা হতে পারতো!
সেদিনের একদিন আজকে হতে পারতো!
আজকের আকাশ টা সুন্দর না রে?
- আকাশ ফির সুন্দর এইটা কেমনে বুঝা যায়?
চারপাশ টা দেখেই বুঝা যায় রে, তুই তো বুঝিস না।
-কি জানি ভাই, তুই আর তোর এইসব ভাবনা চিন্তা। কিন্তু গরম পরছে।
আইসক্রিম খাবি?
-খাওয়াবি?
হ্যাঁ! আমিএ ফুল কিনে দিব, আমিএ ভাড়া দিব, আমিএ খাওয়াব? তুই খাওয়া!
-আচ্ছা চল, খাওয়াচ্ছি! কোনটা খাবি?
যেইটা খাওয়াবি!
অইদিক টায় যাই, আকাশ টা কিন্তু সুন্দর আসলেই আজকে অনেক। ফোন টা দে তো। একটা ছবি তুলি আয়, তুই খাওয়াইলি বলে কথা, আমাকে দিস, মনে পড়বে!
-তুই যাবি কখন?
কেন? একটু পরেই।
-না, এমনিই বললাম। অনেকদিন পর দেখা হইল তোর সাথে।
হু, তুই তো হেলির ধূমকেতু, একদিন দেখা পাইলে সাতদিন নাই।
-আরে নাহ, কাজ ছিল একটু, আর একটু অসুস্থ ছিলাম।
আগেই বলছিলাম, চুল ভিজা থাকলে অসুস্থ হবি। হইল?
-আরে ধ্যাত!
আচ্ছা শুন, আমি একটা কিছু লিখছি, থাম বের করি।
-ফের কি লিখসিছ? দেখা।
না, আমি পড়ব তুই শুন।
-আচ্ছা বল, শুনি
যে ভোরটা আমার রঙ তুলির ক্যানভাসে আঁকা,
যে সকালে আমার লেখা গান নিয়ে পাখিরা ডাকে,
যে দুপুরের কৃষ্ণচূড়ার লাল ছায়ার স্মৃতি জাগে,
যে বিকেলে কনকচাঁপা রা একান্তে গল্প করে,
যে সন্ধ্যের বাতাসে আবেগের সূর্য ডুবতে থাকে,
যে রাতে জোৎস্না আর অশ্রু পাশাপাশি অপেক্ষা করে-
যে কবিতায় প্রতি চরণে একজনের উপাখ্যান থাকে,
যে নাটকের প্রতিটা দৃশ্যে গল্পের সমাপ্তি টা শুধুই কল্পনায়,
যে উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্রে একটা না বলা প্রশ্নের উত্তর দেয়া,
যে গল্পের প্রতিটা শব্দ সেই রাতের কান্না মুছে দেয়,
যে ছন্দে নিরন্তর নির্বাক হয়ে সবটা বলে দেয়া-
যে খুশিতে শুধু তার খুশি নিয়ে ভাল থাকা,
যে কান্নায় তার মন খারাপের গল্পটা নিজের করে লেখা,
যে অভিযোগে খুব কাছের করে নেয়ার প্রয়াস,
যে অভিমানে হারানোর ভয়েরা বজ্রপাত নিয়ে আসে,
যে যন্ত্রণা ভুলে থাকা ছবির রঙকে আরও তীব্র করে দেয়-
সেই সময় গুলো একটু একটু করে সাজিয়ে,
সেই কবিতার চরণ গুলো খুব যত্ন করে,
সেই অনুভুতিদের ভিড়ে তোকে খুঁজে পাওয়া-
সেদিনের সেই মেঘেরা ফিরে এসে শেষ একটাবার,
যদি গল্পের সবটা নিজের মতো হত-
-থামে গেলি যে, শেষ কর।
নাহ আর নাই রে, শেষ! তোর কেন মনে হইল আরও আছে?
-কি জানি মনে হইল আরও একটু আছে। সুন্দর লিখছিস! কিন্তু বুঝা এখন সবটা।
আজব। না বুঝেই সুন্দর বললি?
-আরে না, মানে যা বলতেছিলি সামনে ভাসে উঠতেছিল।
ওইটাই অনেক।
-আমার আইস্ক্রিম শেষ! তোরটা?
আমি তো বলতে বলতে অর্ধেক গলায় দিছি!
-আচ্ছা চল, উঠি। বাসায় যাব!
হ্যাঁ চল। তুই রিক্সা নে। আমি হাটে আগাচ্ছি!
-আচ্ছা রে গেলাম। থাক। দেখা হবে।
হ্যাঁ যদি আসিস তো!
-অই তুই তো বললি না যে আকাশ কেমনে সুন্দর লাগে!
শুনতে হবে না, যা! টাটা!
সেদিন যাওয়ার সময় এত চিল্লায় রিক্সা ডাকছিলি, আমার কানে এখনো লাগে আছে!
এখনো মে মাসে ভালই গরম পড়ছে। সেই মাঠেই বসে আছি। আইস্ক্রিম এর দোকান টা আর নাই। একটা রেস্তরা হয়ে গেছে।
জানিস কি তুই? আজকের আকাশ টাও অনেক সুন্দর। সেদিনের মত। কিন্তু আজকে আমার লেখা টা শুনানোর জন্য পাশে তুই নাই। গল্প করার মতো তুই টা নাই। একটা ভীষণ রকমের একাকীত্বের মধ্যে আজকে আমার বাঁচে থাকা।
কি জানি কোত্থেকে বৃষ্টি নামল। একেবারে রোদ থেকে বৃষ্টি। সবাই দেখি একটা কিছুর নিছে যাইতে উঠে পড়ে লাগছে। আমি গেলাম না, কারন যাইতে গেলেও ভিজেই যাইতে হইত। তার চেয়ে অলসের মতো হাঁটা টাই আরামের, একটু ভিজাও হবে এই সুযোগে। যাই হোক, বৃষ্টি থামলে ফিরা শুরু করলাম, কি মনে করে ফোন টা বের করে হাতে নিলাম, ভিজে টিজে নষ্ট হইল কিনা একটু ঘুতঘাত করে দেখতেই দেখি সেদিনের সেই ছবিটা চলে আসছে। তোর সাথে বসে আইসক্রিম খাওয়ার। তোর হাসিটা! আমার দেখা এখনো সবচেয়ে সুন্দর জিনিস রে। সামনে থেকে যখন দেখতাম তখন খালি ভাবতাম সারাজিবন এই হাসিটা যদি আমার সামনে থাকত!
তুই নাই আজকে। হয়তো নাই, কিন্তু তোর সবটা অস্তিত্ব এখনো একটু আগের বৃষ্টির মতো আমাকে ভিজায়ে রাখে রে সবসময়।
মেঘ সরে নাই ভালোভাবে , হাটে একটু এগোতেই দেখি একটা দোকানের বাড়ানো টিনের নিচ থেকে একটা মেয়ে দৌড়ায় অটোতে উঠে চলে গেল, গায়ে নীল রঙের জামা। একটু দুরেই ছিল, মাটিতে পা পরতেই মনে হচ্ছিল যেন একটা মৃদু কম্পন হচ্ছে, এত জোরে কদম ফেলা তার। অটো ঘুরিয়ে আমার সামনে দিয়ে গেল, আমি থমকে যাই.....................
সেদিনের সেই আইসক্রিম খাওয়ার সময়ের সাথে আজকের ব্যবধান সব দিক থেকেই যোজন যোজন, কিন্তু একটা জায়গায় সেদিনের সাথে আজকের অনেক মিল ছিল, সেটা তুই। কেন তাহলে? তোর কথা এভাবে ভাবা টা নিতান্তই কাকতালীয়। বৃষ্টি না হলে হয়তো তোর সেই ছবিটা দেখতাম না আজকে। কিন্তু তুই বাস্তবে দেখা দিবি, এটা কোনোদিনও ভাবি নি।তোকে একইরকম লাগতেছিল আজকেও। আমার সেই তুই এর মতই ছিলি। একটা নিঃশ্বাস, কিছু নীরবতা, কিছু স্মৃতি, একটা অব্যাক্ত কোনকিছুর আবির্ভাব, তোর শব্দে আমার কথা বলা। সবটাই এই এতোকে একইরকম লাগতেছিল, মুখে হাসিটা ছিল না খালি, খোলা চুল আর নীল জামায় তুক মুহূর্তে আমাকে তোর অনেক কাছ থেকে ফিরায় নিয়ে আসছিল রে, সেদিনের মতই আজও! সবটা এভাবে কেন হল? কিভাবে হল? উত্তর পাওয়া কোনদিনই সম্ভব না। কিন্তু একটা উত্তর ছিল। তুই চলে গেলে আমি সেটা নতুন করে আবিস্কার করি।
তুই সেদিন আমার লেখাটা থামে যাওয়ার পর বলছিলি তোর মনে হইছিল আরও কিছু লাইন বাকি আছে! আমি জানি না তুই ভাবে বলছিলি নাকি এমনিই বলে দিছিলি। কিন্তু সেদিনের সেই তোর প্রশ্নের সত্য উত্তর টা তোকে দিতে পারি নি, তবে কি সেই গল্পের মেঘেরা আবার এসে আমাকে বলে গেল যে তুই উত্তরটা জানতি!
যদি সেদিনের শেষ লাইন গুলা তোকে বলতে পারতাম-
তোর পাশে থাকার তুচ্ছতম অধিকার টা চেয়ে-
আজ এই বিকেলের সবটা কে সুন্দর ভেবে,
তোর পায়ের সাথে যদি হাঁটতে চাই শেষ টা অবধি,
দূরে না রেখে একবার সাথে চলবি?