আজকে বুদ্ধিজীবী দিবস। খবর, পত্রপত্রিকায় ঘটা করে শহীদদের ছবি দিচ্ছে, গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র আর চীনেরও ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলছে, সারাবছর হাওয়া থেকে শুধুমাত্র এই দিনে বিচারের জন্য তোরজোড় প্রতিবছর এ যেন রুটিন মাফিক ফর্মালিটিতে পরিণত হয়েছে। অবশ্য এই অতি ন্যায়সম্মত দাবি একদম ভুলে যাবার থেকে বছরে অন্তত একবার মনে পড়াও স্রেয়!
ব্যক্তিগতভাবে এই বুদ্ধিজীবী হত্যা আমাকে প্রায়ই হতাশ আর বিচলিত করে। যখনই ফুলার রোডের আবাসিক এলাকায় ঢুকি মনটা খারাপ হয়ে যায়, সাদা পুরোনো ঠান্ডা কোয়ার্টার, প্রায় শতবছরের পুরোনো কিছু কড়ই গাছ বারবার গণহত্যায় শহীদ হওয়া অধ্যাপকদের কথা মনে করায় দেয়। এইসব বাসা থেকেই অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র, মোফাজ্জল হায়দার সাহেবদের মতন জ্ঞানীগুণীদের রাতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সেসব পরিবার এখনও তাদের বাবা, স্বামী হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছে। কিছুদিন আগে গোবিন্দচন্দ্র স্যারের মেয়ের ডকুমেন্টারি দেখছিলাম, উনি বর্ণনা দিচ্ছিলেন কোয়ার্টারে তাদের বাসার পিছন গেট দিয়ে সন্ধ্যার পর তার বাবাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আমি মাঝে মাঝে তাদের ওই সময়টায় নিজেকে বসানোর চেষ্টা করি। কোনো ভাবেই কল্পনায় আনতে পারিনা আমার বাবাকেও এভাবে হানাদার বাহিনীরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে! আল্লাহ সকল শহীদদের বেহেশত নসিব করুক।
Source
আবার ক্যাম্পাস থেকে শাহবাগ যাওয়ার পথে নজরুলের কবরস্থানে মাঝে মাঝে যাই, ওখানে জয়নুল আবেদিন কামরুল হাসানের পাশে শহীদ শিক্ষক সিরাজুল হক সহ বেশ কিছু শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সমাধীস্থল রয়েছে। শীতকালে গোলাপী কাঠগোলাপ তাদের কবরে ছড়ায় থাকে, আর গ্রীষ্মে কৃষ্ণচূড়া, কিছুক্ষণ থেকে তাদের জন্য দোয়া করে এরপর ফিরি।
সবাই বলে এই স্বাধীনতার "যুদ্ধে" বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে, কিন্তু আমি তো একে যুদ্ধ বলারই পক্ষপাতী না। যুদ্ধ তো তাকে বলে যখন দুই পক্ষ একসাথে লড়ে, এখানে যা হয়েছে তা তো পুরাই একতরফা। অপারেশন সার্চলাইট, দশ লক্ষ মানুষকে জোরপূর্বক শরনার্থী বানিয়ে ভারতে পাঠায় দেয়া, হিন্দুদের প্রতি অমানুষিক নির্যাতন, জাতিকে মেধাশূন্য করার পায়তারা এসবকে তো আর যুদ্ধ বলা যায় না। মুনীর চৌধুরী, জহির রায়হানের মত বুদ্ধিজীবীরা থাকলে দেশ আরও কত আগাতো এই আফসোস আমার কখনও যাবে না।
পাকিস্তানি মানুষ, সংস্কৃতির প্রতি আমার ভালোবাসা আছে, কিন্তু যতদিন না পর্যন্ত তাদের উপরি পর্যায় থেকে এই গণহত্যার জন্য ক্ষমা না চাওয়া হচ্ছে তাদের প্রতি এই ভয়ংকর রাতের ঘৃণার রেষ শেষ পর্যন্ত থেকেই যাবে।