আজকের এই সভ্যতার তৈরির পেছনে যদি কোনো পেশার সবথেকে বেশি অবদান থেকে থাকে তা হলো শিক্ষকতা। এই শিক্ষকতাকে অন্যসব চাকুরীর থেকে আলাদা করা যেতে পারে শিক্ষার্থীর থেকে প্রাপ্ত সম্মান ও অপূর্ণ ভালোবাসার মাধ্যমে। বহু বছরের পুরোনো ছাত্র যখন হুট করে এসে কদমবুসি করে শিক্ষকের বুকটা তখন গর্বে ভরে যায়। আমার বাবা শিক্ষকতা পেশায় থাকাতে ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক কেমন হতে পারে তা খুব কাছ থেকে দেখেছি। বেশিরভাগ সময় ছাত্রদের কাউন্সিলিং করানোর দায়িত্ব পালনের জন্য কিছু ছাত্র তাকে অন্ধের মত ভক্তি করে। উনি দেশে বিদেশের যেই প্রান্তেই যাক না কেনো যদি কোনো ছাত্রের নজরে পড়ে তাহলে তার আতিথ্যেয়তার আর কোনো কমতি হয় না। ছাত্রদের এই অতিমাত্রার আপ্যায়ন থেকে রেহাই পেতে যতটা সম্ভব তিনি পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন। আবার কোনো ধরণের বিপদে পড়লে এই ছাত্ররাই সবার আগে ছুটে আসে।
অন্য সব পেশায় টাকা, সুযোগ সুবিধা, ক্ষমতার স্বাদ অনেক বেশি থাকলেও শিক্ষকতায় এই যে সম্মানটা পাওয়া যায় তা অন্য সব কিছুকে ফিকে করে দেয়। কিন্তু আমরা যখন এই সম্মানটাই তাদের দিতে ব্যর্থ হচ্ছি তখন শিক্ষকের পাশাপাশি এ সমাজের মাথাও ক্রমাগত নুয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনের পত্রিকা ঘাটলেই বেরিয়ে আসে অসহায় শিক্ষককে বিব্রত, অপমান আর অপদস্ত করার উল্লাস। ধর্মীয় মত প্রকাশের জন্য জেলে যাওয়া, পায়ে হাত দিয়ে মাফ চাওয়া, জুতার মালা গলায় পরিয়ে হাটানো, এমনকি শিক্ষককে পিটিয়ে মেরে ফেলার মত কাহিনী পর্যন্ত দেখতে হচ্ছে।
এভাবে যদি শিক্ষকদের মর্যাদাহানির ঘটনা বাড়তে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে অনেকেই এই পেশায় আসতে ভয় পাবে। অপমানের ভয়ে তারা হয়তো শুধু ক্লাসরুমে যাওয়া আসাই করবেন, শিক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বড় যেই দায়িত্ব ছাত্রদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সেসবের তাগাদা বা সদিচ্ছা হয়তো আর থাকবে না। আমাদের ভুলের কারণেই সমাজের অধঃপতন তখন দেখতে হবে।আমরা যদি এভাবে শিক্ষকদের সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে এধরণের একের পর এক বিব্রত অবস্থায় ফেলি তাহলে সমাজের অবক্ষয় নিজের হাতেই ডেকে নিয়ে আসবো। এত প্রতিকুলতার মধ্যে রেখে তাদের থেকে আবার মানসম্মত শিক্ষা দানের আশা করা কম হাস্যকর নয়।