সেদ্ধ মিষ্টি আলুর কয়েক টুকরো পেটে জামিন দেয় ওসমান। ভাতের অভাবে অন্য কিছু দিয়ে উদরপূর্তির নাম চাষী-মজুরের ভাষায় পেটে জামিন দেয়া। চাল যখন দুর্মূল্য তখন এ ছাড়া উপায় কি?
আবু ইসহাকের জোঁক গল্পের শুরুটা এমনই ছিল।
হয়তোবা সেদিন খুব দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের দুর্দশাও এই পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে। সেই কবে করোনা মহামারী হয়েছে, তারপর থেকে সবাই গৃহবন্দী।
বাস্তবিকভাবে গৃহবন্দী না হলেও মনের দিক থেকে ঠিকই খোয়াড়ে বন্দি হয়ে আছে। না পারছে মধবিত্তের তকমা ছেড়ে রিক্সার হ্যান্ডেল ধরতে, না পারছে জীর্ণ শীর্ণ বেল্টটা কোমরে পেঁচিয়ে শার্টটা ইন করে অফিসে যেয়ে মাস শেষে বেতন তুলতে। উপরন্তু মাসের টাকাটা নান ধারদেনা শোধ করতেই ফুরিয়ে যায় যায় ভাব। কিন্তু ঘরে যে নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয় মুখগুলো তাকিয়ে আছে। তাদের মুখে খাবার না তুলে দিতে পারলে যে নিজের মনেই শান্তি লাগে না, আর অন্য কেউ তো এসব নিয়ে ভাবেই না। তো, কি আর করা?
এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে, নতুন দিনের প্রতাশ্যায়, ভালো দিনের আশায়।
কিন্তু সেই দিন কি আর আসার কথা একবারও ভেবে দেখসে? নাহ, মনে তো হচ্ছে না।
দেখতে দেখতে বছর পেরিয়ে গেলো। এই তো যাবে যাবে করেও গেলো না, উল্টো আরো জেঁকে বসছে। দেখে মনে হচ্ছে সাধারণ মানুষ গুলোকে ওপারে নিয়ে যেতে জমদেবতা কোনোরূপ ত্রুটি রাখসে না। কিন্তু জমদেবতা যে আর একজনের হুকুমে চলে। তাই বোধহয় এখনো খেটে খাওয়া মানুষ গুলো বেঁচে আছে। দিনে দতিনবেলা না হোক অন্তত ১ বেলা হলেও ভাতের বেবস্তা করে দিচ্ছেন। আর এতেই তারা সাহস পাচ্ছে আগামীকে মোকাবেলা করার, আরো একদিন বেঁচে থাকার।
তবে নীরবে কাঁদার দিন বুঝি আর থাকলো না। এখন থেকে বোধহয় চিৎকার করে কাঁদতে হবে, ফুঁপিয়ে কাঁদা আর আসবে না। কারণ রোজা যে শুরু হয়ে গেছে। যে জিনিসের দাম ছিল ১০ টাকা, সেটাই এখন ৩০ টাকা না হলেও ২৫ টাকার কমে আর পাওয়া যাচ্ছে না। কিভাবে কিনবে সাধারণ মানুষ? এখন তো একটা কিনতে গেলে সাথে আরো ২ টা জিনিস না কিনেই ফিরে আসতে হচ্ছে। আধপেটা খাওয়ার বিপরীতে এখন তার থেকেও কম খেয়ে কাজে যেতে হচ্ছে। তবে একটা দিক ভালো হয়েছে, কোনোরকম সেহরিতে পেটে কিছু দিতে পারলে সারাদিন আর চিন্তা থাকবে না। সৃষ্টিকর্তা হয়তোবা এতটুকু ব্যবস্থা করেই দিবেন। তবে আর চিন্তা কি?
এখন চিন্তা থাকলো কিভাবে ঈদ এর দিন পরিবারের সবাইকে একটু বিলাসিতার স্বাদ দেয়া যায়। ঈদ যে পড়েছে মাসের মাঝখানে, মাসের শুরুতে যা পাবে তা দিয়ে কি আর ঈদ এর আনন্দ এবং পুরো মাস চলবে?
তবে চালিয়ে নিতে হবে, চালিয়ে নিয়েছে এর আগেও, ভবিষ্যতেও নিতে প্রস্তুত আছে। শুধু নিজের শখ গুলো পূরণ হবে না, তাতে কি? আমরা যে বাঙালি। নিজের জন্য আর কয়জন ভাবি?
আমাদের আছে অফুরন্ত আবেগ, এই আবেগের কাছে আমরা আমাদের নিজেদের শখ আল্লাদকে বিসর্জন দিতে কুন্ঠাবোধ করি না। কোনো এক বছরে কেনা টুপি আর পাঞ্জাবিটা তো আছেই, নতুন কেনার কি দরকার? ওটার টাকা দিয়ে তো দিব্বি সেমাই আর মাংস হয়ে যাবে।
সাদা পাঞ্জাবিটা একটু নীল দিয়ে ধুয়ে ইস্ত্রি করে নিলেই তো হয়ে যাবে, নামাজ পড়তে তো আর সৃষ্টিকর্তা নতুন জামা পড়তে বলেননি।
তবে, দূর হোক এই অভিশাপ, সবাই থাকুক আনন্দে, সৃষ্টিকর্তা কিন্তু এটা চাইলেই পারেন।
যেহেতু রোজার মাস দোআ কবুলের মাস, তাই এই দোআটা আমরা করতেই পারি।