আমাদের মানবীয় গুনাবলী সমুহের মধ্যেকার যে খারাপ দিকগুলো বড় বড় বিপর্যয় ডেকে আনে, "রাগ সংবরণ করতে না পারা" তার মধ্যে অন্যতম। অল্পতেই রেগে যাওয়া কিম্বা রাগের সময় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ব্যক্তিদের দ্বারা রাগান্বিত অবস্থায় যে কি মারাত্নক বিপদ হতে পারে তার একটা উদাহরণ কয়েকদিন আগে ঘটেছে আমার বাড়ির পাশেই।
সপ্তাহখানেক আগে, ওমানে কর্মরত একজন বাংগালীর হাতে খুন হয়েছে তারই দুইজন আত্নীয়!! মাত্র ৪০ ওমানী রিয়াল নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে ছুরি দিয়ে হত্যাই করে ফেলেছে তার মামা সম্পর্কিও দুইজনকে। আরেক জন এখনো হাসপাতালে ভর্তি। হত্যাকারী পুলিশের হাতে আটক!
মুহুর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় একমাত্র বিজয়ী পক্ষ হচ্ছে মানুষের চির শত্রু শয়তান। শয়তানের ওয়াসওয়াসাতে মানুষ যখন নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তখন সে নিজেই হয়ে ওঠে সাক্ষাৎ শয়তান! অথচ কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে বার বার আমাদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যেন আমরা শয়তানের ফাদে না পড়ি। এজন্য রাগ সংবরণের উপকারিতা এবং উপায় সম্পর্কে ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। এ সম্পর্কিত কয়েকটা হাদিস আমরা জানার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
রাগ সংবরণ করতে পারা ব্যক্তিই হচ্ছে প্রকৃত বীর। সুনান আবু দাউদ থেকে নেয়া। আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, একদা রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমাদের মধ্যকার কোনো ব্যক্তিকে তোমরা বড় বীর মনে করো? সাহাবীগন বললেন, যাকে কেউ যুদ্ধে হারাতে পারে না। রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ না , বরং প্রকৃত বীর হলো সেই ব্যক্তি যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।[১]
রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা ব্যক্তির জন্যে আখিরাতে আছে উত্তম প্রতিফল। সুনান আবু দাউদ এ বর্ণিত, সাহল ইবনু মু’আয (রাঃ) হতে তাঁর পিতা থেকে বর্ণিতঃ
নাবী (সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি তাঁর রাগ প্রয়োগের ক্ষমতা থাকা সত্বেও সংযত থাকে, ক্বিয়ামাদের দিন আল্লাহ তাকে সকল সৃষ্টিকুলের মধ্য হতে ডেকে নিবেন এবং তাকে হুরদের মধ্য হতে তাঁর পছন্দমত যে কোন একজনকে বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দিবেন। [২]
অত্যধিক রাগের সময় যেহেতু মানুষ শয়তানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, সেহেতু শয়তান তাড়ানো হচ্ছে প্রথম কাজ। এজন্য আমাদেরকে আউজুবিল্লাহি মিনাশ্ শায়তনীর রজীম পড়তে হবে। সুলাইমান ইবনু সুরাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন , দুই ব্যক্তি রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সামনে পরস্পরকে গালি দিতে লাগলো। তাদের একজনের চোখ লাল হতে থাকে ও ঘাড়ের রগ মোটা হতে থাকে। রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আমি অবশ্যই এমন একটি বাক্য জানি এ ব্যক্তি তা বললে নিশ্চয়ই তার রাগ চলে যাবে। তা হলো : অভিশপ্ত শয়তান হতে আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইছি। লোকটি বললো, আপনি কি আমার পাগল ভাব দেখছেন! [৩]
শরীরের অবস্থাগত পরিবর্তন রাগের তীব্রতাকে কমিয়ে দেয়। রাগান্বিত দাড়ান ব্যক্তি ধরে বসিয়ে দিতে হবে।
আবু যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কারোর যদি দাড়াঁনো অবস্হায় রাগের উদ্রেক হয় তাহলে সে যেন বসে পরে। এতে যদি তার রাগ দুর হয় তো ভালো, অন্যথায় সে যেনো শুয়ে পরে। [৪]
আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই রাগান্বিত হবার খাসলত আছে, কেউই তা থেকে মুক্ত নই। কিন্তু আমাদেরকে জানতে হবে কিভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আমাদের চিরশত্রু শয়তানকে জিততে দেয়া যাবে না। অন্যকেও সাহায্য করতে হবে যেন তারা রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
আমাদের প্রিয় নবী সাঃ এর কাছে কেউ কোন পরামর্শ চাইতে আসলে তিনি ওই ব্যক্তির জন্য স্পেসিফিক পরামর্শটাই দিতেন। একবার এক ব্যক্তি এসে রাসূল সাঃ এর কাছে কিছু শিখতে চাইলেন। কুরআন বা অন্য কিছু না শিখিয়ে তিনি তাকে বললেন "ক্রোধ প্রকাশ করো না, উত্তেজিত হয়ো না"। লোকটি যতবারই কিছু শিখতে চাইল, ততবারই আল্লাহর রাসূল সাঃ একই উত্তর পুনরাবৃত্তি করলেন। [৫]
আল্লাহর রাসূল সাঃ এর কাছে নিশ্চয় ঐ ব্যক্তির অত্যধিক রাগের কোন তথ্য ছিল, তাই তিনি তার এই খারাপ আচরণ সংশোধনের জন্যে বার বার তাকিদ দিয়েছেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন যেন আমরা আমাদের রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। আমিন।
হাদিসগুলো আল হাদিস (Al Hadith) Android App থেকে নেয়া।