“মরার উপর খরার ঘা” কথাটির অর্থ জানেনা এমন লোক বাংলাদেশে হয়তো কমই আছে। তারপরও যারা জানেন না তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে হচ্ছে-এর অর্থ হল “এক বিপদের উপর আরেক বিপদ”। অর্থাৎ এক বিপদ কাটতে না কাটতেই আরেক বিপদ এসে হাজির। যাই হোক বিপদ প্রকৃতি থেকে আসে আর তাৎপর্য নিয়েই আসে। তাৎপর্য ছাড়া মহান আল্লাহ তায়ালা কোন কিছুই দুনিয়াতে পাঠান না। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে তার বান্দাদের স্বাধীনভাবে পাঠিয়েছেন ও অপার স্বাধীনতা দিয়েছেন। ইচ্ছে করলে সে ভালো কাজ করতে পারে আবার খারাপ কাজও করতে পারে। এ দুটি পথের যেকোন একটি তার বান্দা বেছে নিতে পারে। এতে তার বান্দাদের তিনি পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। আমরা দুনিয়াতে অনেক অন্যায়-অপরাধ করি। কেউ জেনে করি আবার কেউ না জেনে করি। কিন্তু মহান প্রতিপালক সাথে সাথে তার বান্দাদের কোন শাস্তি দেন না। যদি সাথে সাথে শাস্তি দিতেন তবে মাঝে মাঝে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে আমাদের সতর্ক করতেন না। যাই হোক করোনা ও বন্যা এই দুটো তো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাই আমার এত কিছু লেখার অবতারনা। বান্দা যখন তার বাড়াবড়ির সীমা লংঘন করে ফেলে তখই প্রকৃতি থেকে এই দুর্যেোগগুলো আমাদের জন্য সতর্ক বার্তা নিয়ে নেমে আসে।
করোনা ভাইরাস: এটা একটা বৈশ্বিক মহামারী। যার ভয়াল থাবায় সারা পৃথিবী আজ জর্জরিত। বিশ্বের এমন কোন দেশ নেই যারা করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-থ্রীস্টান,ইহুদি-নাসারা, ধনী দরিদ্র সবাই এর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এ মহামারি ভিইরাসটি সারা পৃথিবীর অর্থনীতিকে পর্যুদস্ত করে দিয়েছে। বিশ্বের এক প্রান্ত অন্য প্রান্তের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আমদানী-রপ্তানী থেকে শুরু করে গণ যোগাযোগসহ যাবতীয় মাধ্যম পর্যুদস্ত হয়ে গেছে। মানুষের জীবন-জীবিকা থেকে শুরু করে মানুষের আশা-ভরসা ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সবই ধূলিষাৎ হয়ে গেছে এই সর্বনাসা মহামারিতে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
বন্যা: করোনা ভাইরাস এখনও বাংলাদেশে পূর্বের ন্যায় বিদ্যমান। বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্র দেশে একটা মহামারির মধ্যে আরেকটা মহামারি যে কতটা প্রভাব ফেলেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।করোনার কারনে দীর্ঘদিন বাংলাদেশের মানুষ লকডাউনে থেকে কর্মহীন ও উপার্জনহীন হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। শহরে কর্মসংস্থানের কোন পন্থা খুঁজে না পেয়ে অনেকেই গ্রামে চলে গেছে। কেউ ভেবেছে গ্রামে গিয়ে দিনমজুরী খাটবে আবার কেউ ভেবেছে গ্রামের বাড়ীতে যে জমিজমা আছে তা চাষাবাদ করে জীবন-জীবিকা চালাবে। কিন্তু স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় তাদের সে আশাও বিলীন হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় করোনা ও বন্যা এক সাথে হানা দেওয়ার কারনে এ দুটো দুর্যেোগ এক সাথে মোকাবেলা করার সাহস ও সামর্থ্য বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্র দেশের অধিকাংশ মানুষের নেই। যার ফলে বন্যা কবলিত প্রতিটা জেলার মানুষ খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে।বিশেষ করে উত্তর বঙ্গের ৩১টি জেলার মানুষ বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছ। এসব জেলার অধিকাংশ ঘর-বাড়ী পানিতে তলিয়ে গেছে। অত্র এলাকার বেশির ভাগ মানুষ স্বপরিবারে নৌকায় বসবাস করলেও গবাদি পশুগুলো নিয়ে মারাত্ব ভোগান্তিতে আছে।বেশির ভাগ কৃষি জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কারনে ক্ষেতে থাকা সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে-বিশেষ করে আমন বীজ, সাক-সবজি পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে।
এছাড়াও ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও জাজিরা জেলার মানুষও বন্যায় মারাত্বক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । এসব জেলার ফসলি জমি ও রাস্তা-ঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব জেলা পদ্মা তীরবর্তী হওয়ার কারনে নদী ভাঙন এসব জেলার আরও একটি বড় সমস্যা। এসব জেলার জনসাধারনকে ত্রিমুখী সমস্যা মোকাকবলা করতে হচ্ছে। এসব জেলার বিশেষ করে নদী তীরবর্তী মানুষের অতি পরিচিত ও প্রিয় ঘর-বাড়ী পদ্মায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না।
সিরাজগঞ্জ জলোর প্রতিটি ঘরে তাঁত কারখানা রয়েছে যা তাদের জীবন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। অথচ প্রতিটা তাঁত কারখানাই পানির নীচে ডুবে রয়েছে। এখানে কিছু সরকারী সহায়তা পৌছালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগন্য।
বন্যা কবলিত প্রতিটি জেলার মানুষ নতুন করে কর্ম হীন হয়ে পড়েছে এবং পর্যাপ্ত সরকারী সহয়তা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে এবার তিন দফায় বন্যা আঘাত হেনেছে। ১৯৯৮ সালের বন্যা দুই মাসেরও অধিক স্থায়ী ছিল । এবারের বন্যাও এক মাসের বেশি সময় ধরে চলছে। এবারের বন্যাতে অনেক মানুষ মরোও গেছে।অন্যান্য বছরের বন্যার তুলনায় এবারের বন্যার পার্থক্য হচ্ছে এবার এক তো করোনা ভাইরাস তার উপর বন্যা।এছাড়া কিছু এলাকায় রয়েছে নদী ভাঙনের প্রকোপ। এ যেন “মরার উপর খরার ঘা”