দ্বিতীয় পুরুষ
"এলে অবশেষে? ভাবলুম গড়িমসি করতে করতে শেষ অব্দি কেটে পড়বে। সাত সকালে এই নির্জন আর্তনাদের কোলে অস্থির পায়চারিতে কল্পনায় দেখলুম তোমার কপালে ভাঁজ, ওতে ক'বিন্দু জল ধীরে ধীরে ফোঁটায় পরিণত হচ্ছে। পায়চারি করছো তুমিও, আগত সিদ্ধান্তের আদ্যপ্রান্ত যাচাই করছো ঝড়ের গতিতে। এভাবে সংসার ছেড়েটেড়ে পথের মায়া তোমার সইবে কিনা ভাবছো। ধরনীমাতার ডাক উপেক্ষার চেয়ে সাড়া দেয়া যে বেশী কঠিন!"
"ডানে বামে চেয়ে কাকে খুঁজছ বাপু? তোমাকেই বলছি। আটপৌড়ে সংসারে দম ফেলবার ফুসরত পাওনা। এ মাসের চালচুলোর যোগান দিতে না দিতেই পরের মাস হাত নেড়ে শুধোয়। গতমাসে ভাবলে কিছু টাকা জমিয়ে এযাত্রা জিনিসটা কিনেই ফেলবে। কতকাল ধরে ভাবছো হাতে পেলে মন্দ হতো না। কিন্তু খরচ তো হয়ে গেলো। না করেও পারলে না। সকাল সন্ধে অফিস করো পরের ঘানি টেনে, দুদণ্ড সময় নিজেকে দিতে পারো না। একই রোজনামচায় পিষ্ট হয়ে অবরে-সবরে মুক্তির উপায় খোঁজো। অবশ্যই মনে মনে। বুক ফেটে বলে ফেললে লোকে পাগল ঠাওড়াবে। ওদের কাছে এই টিকে থাকা।"
"হেসো না, হেসো না। তোমার স্বতন্ত্র বলছি নে। এই একটু-আধটু ছুটন্ত উড়ুউড়ু মন সকল মনুষ্যসন্তানের সহজাত। কোটি বছরের বাঁধনহারা মুক্ত বিহঙ্গকে মাত্র ক'শ বছরে বন্দিত্ব স্বীকার করানো যায় না। কিন্তু সমাজ-সংসার রশি দিয়ে ঠিকই বেঁধে রাখতে চায়, যেন হাটে কেনা গোরু। হাজারটা দায় রঙবেরঙের কর্তব্যের মোড়কে হাজির করে নিজেকে জাহির করে নেয়। তবুও ছাপোষা লোকে মিছি মিছি সান্ত্বনা খুঁজতে পর্যটকের বেশ ধরে। কিন্তু ওতে তোমার পোষাবে না। পিছুটান কর্তনেই তোমার চূড়ান্ত মুক্তি। তুমি বেরিয়ে পড়বে, গন্তব্যহীনতা তোমার মুক্তির স্বরূপ। সময় যেথায় নেবে, সেথাই গন্তব্য।"
"বোঁচকাবুচকি নিয়ে এসেছো দেখছি। বেশ। মন ঠিক করেই নেমেছো বুঝলুম। শুরুতে যে কেটে পড়ার কথা বললুম, ওতে রাগ করো না তবে। না, না, গাল ফোলানোও চলবে না। অন্তরাত্মায় যে পেন্ডুলাম দুলিয়েছো, আমি তা নিয়ে ওয়াকিবহাল, বাইরের কেউ তো নই।
যাক, ভালো করে চেয়ে দেখো তবে চারপাশ। এই নালার বহমান জলরাশি হোক তোমার স্বাধীনতার রূপক। আর ওই কালচে, শ্যাওলার আচ্ছাদনে মোড়া পাথররাজি হোক বাঁধা। সহস্র পাথরের ফাঁক গলে জল বইয়ে যায়, তুমিও বইয়ে যাবে।"
"দেখো দেখো, ঘন বাঁশের তীব্র প্রতিবাদ উপেক্ষা করে রবির প্রেম স্পর্শ করছে নালাকে। অগুনতি রশ্নির ফোটনমালার উচ্ছল উচ্ছ্বাসে গোটা বন উন্মত্ত্ব। এই তোমার প্রাপ্তি, একদম মানানসই।
ঐ শোনো। কান পেতে শোনো। গভীর সবুজ হতে অচেনা উড়ুক্কু সৈনিক তোমার যাত্রার জয়গান গাচ্ছে। ওর ডানার আওয়াজ পাও না? ওর সুমধুর কলতান শোন না?"
"দু-পা বাড়িয়েছো, আর পেছনে ফেরা চলবে না। আগ বাড়ো। সাবধানে, পাথরগুলো বাঁধ সাধতে সাধতে আজ পিচ্ছিল। হাত বাড়িয়ে দিলে? দাও দাও, লজ্জ্বার কিছু নেই। পথ চলতে সঙ্গী লাগে বটে। নিলাম হাতে হাত। আজ তুমি ঘরে ফিরে যাচ্ছো। আদিমতম ঘর। দ্বিতীয় পুরুষ আমি সঙ্গী হয়ে রবো পাশে। চিরঞ্জীব হোক এ বন্ধন!"
photo credit @zayedsakib