সেদিন ডকুমেন্টারি নিয়ে আলাপে প্ল্যানেট আর্থের কথা উঠলো। প্ল্যানেট আর্থ আমার দেখা সেরা ডকুমেন্টারিগুলোর একটা এবং সেরা সিরিজগুলোর ভেতরও বেশ উপরে থাকবে। বেশ কবছর আগে প্ল্যানেট আর্থের অসাধারণত্ব নিয়ে লিখেছিলাম।
Planet Earth II এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো— ব্যক্তিগত গল্প। মানুষের না, প্রত্যেক স্বতন্ত্র জীবের। সাধারণত ন্যাচার ডকুমেন্টারিতে প্রজাতি ধরে তাঁদের আচার আচরণ, প্রজনন, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি বিষয় দেখানো হয়। অন্যদিকে Planet Earth II প্রজাতির হিসেব পাশে রেখে সরাসরি কোন ব্যক্তি জীবের উপর নজর দিয়েছে। আর এরাই নিজ নিজ প্রজাতিকে রিপ্রেজেন্ট করছে। আমরা একগাদা পাখির পরিবর্তে— জনাব পাখিকে দেখতে পাই।
মানুষকে দিয়ে উদাহরণ দিই। প্রজাতি হিসেবে আমাদের সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। আমরা সমাজে বড় হই, বড় একটা সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাটাই, বিয়ে করি, সন্তান জন্ম দেই, বুড়ো হয়ে মারা যাই। এভাবে দেখলে ব্যক্তি মানবের সফলতা, ব্যর্থতার গল্প গুলো অজানাই থেকে যায়। কিন্তু মানুষ নিজের গল্প বলতে ভালোবাসে।
Planet Earth II প্রাণীদের ক্ষেত্রে ঠিক সেই কাজটা করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দুর্গম প্রান্তের জীবের জীবন সংগ্রাম তুলে এনেছে একক কোন প্রাণীর মাধ্যমে। হতে পারে কোন মেয়ে চিতাবাঘ, অথবা পুরুষ পাখি কিংবা সদ্য জন্মানো কোন ইগুয়ানা—এরা প্রতিটা খণ্ড খণ্ড গল্পের নায়ক/নায়িকা।
প্রজাতি ধরে নয়, এই একক প্রাণীগুলোর জীবনের সফলতা, ব্যর্থতা, সুখ, দুঃখ বা টিকে থাকার পথের হাজারো লড়াই নিয়ে Planet Earth II. প্রতিটা এপিসোডে আলাদা কিছু ইন্ডিভিজুয়ালের গল্প। কারো জীবনের গল্পে হতভম্ব হয়েছি, কারো পরিবারের জন্যে ত্যাগ স্বীকার দেখে আদ্র হয়েছি, সঙ্গিনী জোটানোর জন্যে কারো বিশাল সংগ্রাম দেখে মজা পেয়েছি আবার কারো দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুহূর্তের সাবলীল সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি।
আর— এই গল্পগুলোর বৈচিত্রতার সাথে বাস্তবতা মেলানো আমার মতো অজ্ঞ মানুষের জন্যে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। মনে হয় যেন বানানো কোন গল্প। প্রকৃতি এত নাটকীয়তার জন্ম দিতে পারে বিশ্বাস হতে চায় না। অবিশ্বাস ভিন্ন একটা উপলব্ধির জন্ম দেয়। মানুষ আমার মতো একটা ছোট্ট হামিং বার্ডেরও কিছু বলার থাকতে পারে নিজের সম্পর্কে। তাঁর বলার ক্ষমতা সরাসরি নেই বলে যে তাঁর কোন গল্প নেই, ব্যপারটা এমন নয়।
মানুষ কোন কারণ ছাড়াই অহমবোধে ভোগে, Planet Earth II তাঁর অহমে দারুণ এক চপেটাঘাত হতে পারে। হাজার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণাদি নাকের সামনে ধরলেও যার টনক নড়ে না, আমি বিশ্বাস করি সেও নড়ে চড়ে বসবে।
প্রকৃতি বিষয়ক ডকুমেন্টারি দেখতে দেখতে খানিকক্ষণপর উৎসাহে ভাটা পড়ে বোরিং লাগতে পারে অনেকের কাছে, যদিনা দর্শকের বিপুল আগ্রহ থাকে। ব্যপারটা বোধগম্য।
প্লানেট আর্থ ২ এসব দর্শককে চেয়ারে আটকে রাখবে স্রেফ ইমোশনাল জার্নিতে। দর্শক হয়ত কোন প্রজাতির প্রতি আবেগ অনুভব করবে না, কিন্তু নির্দিষ্ট কোন প্রাণীর সাথে কখন একাত্ম হয়ে যাবে টের পাবে না। প্রতিটা গল্পের উপস্থাপনা Sir David Attenborough সেভাবেই করেছেন। Planet Earth II এক অর্থে প্রাণীদের ড্রামা, পার্থক্য— এখানে কেউ অভিনয় করছে না। আর যেকোন ড্রামাকে পরাবাস্তব রূপ দিতে ভালোভাবে সক্ষম বিখ্যাত কম্পোজার Hans Zimmer, নিদেনপক্ষে ইন্টারস্টেলার যারা দেখেছেন একবাক্যে স্বীকার করবেন। এখানেও পর্দার ঘটনার সাথে মিউজিকের সুর, লয়, তাল পরিবর্তিত হয়েছে।
প্রযুক্তিকে ধন্যবাদ, এত কাছ থেকে প্রাণীদের জীবন-গল্পগুলো দেখতে পারছি বলে। সেই সাথে কৃতজ্ঞতা ফিল্ড টিমের প্রতিও। তাঁরা কী পরিমাণ কষ্ট করেছে শটগুলো নিতে গিয়ে, সেটা দেখা যাবে প্রতি পর্বের শেষের অংশে।
স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো ৯০ বছর বয়সেও ন্যারেশনে যেন চির নবীন, দৃঢ় কন্ঠ একটুও মলিন হয়নি।
অসাধারণ ক্যামেরার কাজ। অসাধারণ ওয়াইল্ডলাইফ। আর সেই সাথে দুর্দান্ত হ্যান্স জিমার।