বহু বছর আগেই তার্কোভস্কির স্টকার (1979) দেখেছিলাম এবং তখনও আসলে জানতাম না সিনেমাটা একই নামের অন্য একটি বই থেকে চিত্রনাট্য বানিয়ে করা। বইটার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া আর পড়া শুরু করার অভিজ্ঞতা একই সাথে আনন্দময় আর অদ্ভূত ছিলো আমার জন্যে। কারণ কী -- বইয়ের কিছুই যে সিনেমার সাথে মেলে না বাভুল!
দুটো জিনিসে মিল আছে বৈকি। এক, ওই স্টকারেরা যাদের কাজ হচ্ছে 'জোনে' ঘুড়ে-বেড়ানো। আর দুই, জোনটাই -- যেখানে কোন এক সময় মহাজাগতিক অধিবাসীরা ভ্রমণ করে গেছে। যেখানের প্রাকৃতিক নিয়মাবলী আর আমাদের চেনাজানা জগতের মত নেই৷ পদার্থবিজ্ঞানের বিদ্যেও যে ওখানে ফেইল মারছে! জায়গাটা এখন সরকার বা এমন কোন কর্তৃপক্ষ কষে পাহারা দিচ্ছে। ব্যাস। এই বাদে সিনেমা আর বইয়ের ভেতর অমিলই বেশী।
সিনেমায় তার্কোভস্কি জোনকে ব্যবহার করেছিলেন একটা রূপক হিসেবে। যদিও তাঁর কল্পিত দুনিয়ায় জোন বাস্তব একটা জায়গা, শুধুই উৎসাহী মস্তিস্কের কষ্টকল্পনা হয়। কিন্তু জোন আসলে সিনেমায় তার্কোভস্কির উদ্দেশ্য সাধন করছে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি আর ধ্যানধারণাকে উন্মোচন করে দিয়ে। গোটা ব্যাপারটা তিনি সাজিয়েছেন কাব্যিক ভাবে, কিছুটা দার্শনিকের বেশ ধরে।
সিনেমার চিত্রনাট্য কিন্তু বইয়ের লেখকদ্বয়ই লিখেছিলেন। একরকম বলতে গেলে, তার্কোভস্কি গল্পটা পাল্টে ফেলেছেন একদম নিজের মত করে তাও খোঁদ গল্পের স্রষ্টাদের হাত ধরেই। আর সেই সাথে সৃষ্টি করেছেন সম্পূর্ণ নতুন একটি শিল্পকর্মের।
অন্যদিকে বইয়ে মূলচরিত্র এবং কিছু পাতিভিলেন থাকলেও জোনই খুব বড় একটা জায়গা জুড়ে আছে এবং বলা যায় প্রধান খলচরিত্র। জায়গাটার নিজস্ব ইতিহাস আছে, ব্যক্তিত্ব আছে, আছে অতীত এবং ভবিষ্যত। গল্পটা পড়তেও স্বাভাবিক উপন্যাসের মতই লাগে। অবশ্য, উপন্যাসই তো। সিনেমার অন্তর্নিহিত দর্শন যে বইয়ে নেই তাও নয়, তবে উপস্থিত কিছুটা ভিন্নভাবে। কদাচিৎ নৈরাশ্যবাদী, আশাহীন এবং ঘোলাটে। মোটাদাগে বলা যায় অন্ধকারাচ্ছন্ন বাস্তববাদী গল্প, অমোঘ নিয়তির মত যেখানে মানুষ তল খুঁজে পায় না। তবু অন্ধের মত হাঁচড়ে-পাচড়েই যায়।
মূলচরিত্রকে অবশ্য আমার সিনেমা থেকে মানসিকভাবে এবং লক্ষ্যে কিছুটা শক্তিশালী মনে হয়েছে। অন্যজন একদমই ক্লুলেস। যেন ভেসে ভেসে এসেছে, ভেসে ভেসে যাবে। অবশ্য সিনেমার প্রয়োজনেই তেমন।
লেখকদ্বয়ের একজন বইশেষে কিছু টিকা লিখেছেন। ওতে দেখলাম এই বই প্রকাশ করা নিয়ে কী অসামান্য সংগ্রাম আর জটিলতার মধ্যে দিয়েই না গেছেন তাঁরা। জানা গেলো লেখার পর বইয়ের পান্ডুলিপি এক প্রকাশনী থেকে আরেকটায় লাথিগুঁতো খেয়ে বেড়িয়েছে, কেউই প্রকাশে আগ্রহী নয়৷ ৮ বছর ধরে জুতো ক্ষয় আর অসংখ্য কলম খুঁইয়ে অবশেষে লেখকদ্বয় প্রকাশ করতে সফল হন। ঘটনাটা পড়ে অবশ্য খুব অবাক হইনি৷ তৎকালীন কমুনিস্ট রেজিম খোদ তার্কোভস্কির সাথেই যা করেছিলো, তা তো জানিই। তবে সেসব অন্য আলাপ।
বোরিস আর আরকেডি স্ত্রুগাতস্কির আর কোন বই অবশ্য পড়িনি। ইচ্ছা রাখি। বিশেষ করে এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন আরসুলা কে লেগুইন। উনি খুব পছন্দের লেখিকা এবং সাহিত্য দুনিয়ায় বড় একটা জায়গা জুড়ে আছেন। তিনি রোডসাইড পিকনিকের বেশ প্রশংসাও করলেন।
বইটা কিন্তু খুব একটা বড় নয়, এই দেড়শ পেইজের মত। বেশ উপভোগ করেছি।