সেবার রাতে বিরাট ঝড় উঠলো। মোহিনীবাবু এর ভিতর কাঁপতে কাঁপতে এলেন। দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই উনি। এসে বলেন, তপু— বিপদে পড়েছি ভাই। বলেই দুড়দাড় করে ঘরে ঢুকে গেলেন। সাথে নিয়ে এলেন বাইরের কাদাপানি। গামবুটের প্রায় পুরোটা কাদায় মাখামাখি।
— আর বলো না, গর্তে পড়েছিলাম।
— ও...
খোঁড়াচ্ছে মোহিনীবাবু। গর্তে পড়েই পা মচকেছে মনে হচ্ছে। হ্যাংলা পাতলা মানুষ। বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায়নি এই ভাগ্যি। জানা গেলো চৌরাস্তায় যাবেন বলে রওনা দিয়েছেন। শহর থেকে জরুরী দলিল দস্তাবেজ এসেছে। সকালেই লাগবে।
মোহিনীবাবুর অবস্থা দেখে মায়া হলো খুব। মচকানো পা নিয়ে এতদূর যাবে? বললাম, আজ্ঞে আপনি বিশ্রাম করেন আমার এখানে। আপনার কাগজগুলো আমি নিয়ে আসি গিয়ে। মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেলেন।
ভারি কষ্ট হয়েছিলো সেদিন ঝড় ঠেলে কাগজের পোটলা আনতে গিয়ে। তবুও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি বলে কথা। মোহিনীবাবুর জায়গায় যদি আমি থাকতুম, নিশ্চই তিনিও করতেন।
বিধি বাম! ক'মাস পরেই মোহিনীবাবুর দ্বারে হাজির হতে হলো আমাকে। এক চমৎকার উপন্যাসের খোঁজ পেয়েছিলাম রতনদের কাচারি ঘরের আড্ডায়। বইয়ের দোকানে খুঁজে পেলাম না। জানা গেলো মোহিনীবাবুর কাছে আছে। কিন্তু মোহিনীবাবু গড়িমসি শুরু করলেন। ভাবলুম, নিশ্চই তিনি ভাবছেন আমি গোমূর্খ মানুষ-টানুষ, নিশ্চই বইয়ের যত্নআত্মি করবো না। তাই তাঁর মন যোগাতে আশ্বস্ত করতে লাগলাম। কিন্তু মোহিনীবাবু একের পর এক অজুহাত দিয়েই গেলেন। শেষমেষ বই না পেয়ে হতাশ মনে ফিরে গেলাম।
কদিন পর নিরুখালা বাসায় এলে ঘটনা জানতে পারলাম। মোহিনীবাবু এই কাজ হর-হামেশাই করে। তাঁকে দিয়ে কেউ কোন কাজ করাতে পেরেছে বলে নজির নেই। তবে নিজের প্রয়োজনে আত্মীয় স্বজনের কাছে ধর্না দিতে বিশেষ বাঁধে না তাঁর। ক্ষেপে গেলাম।
এক হাত মুঠো করে আরেক হাতের তালুতে কিল মেরে বললাম,
— দেখা হয়ে নিক। দু-কথা শুনিয়ে দেবো।
নিরুখালা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, ওতে ওর বয়েই যাবে। দু-চারটে গালি যে খায়নি তা তো না। উল্টো বেশ মোটা গলায় বলে বেড়ায়, দুনিয়াটা স্বার্থপরদেরই। জয়ী হতে হলে স্বার্থ দেখতে হবে।
এরপর থেকে মোহিনীবাবুর সাথে দেখা হলেই, পকেট থেকে হাত বের করে মুখ কাঁচুমাচু করে বলি— মোহিনীবাবু, ক'টা টাকা দিন না। বলাই বাহুল্য, ফুটোপাইও জোটেনি।
মেলাদিন হলো মোহিনীবাবুর সাথে দেখা নেই। পরে শুনেছি হয়েছিলো কী।
এলাকার এক রাজনৈতিক নেতার সাথে উঠবস শুরু করেছিলেন। নেতার পিছে ঘুরে বেড়ানো চামচদের দেখেছেন বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে নেতার পকেট খসাতে। মোহিনীবাবুও কিছু একটা বানিয়ে নেতার থেকে মোটা টাকা নিলেন। খরচও করে ফেললেন। এরপর নেতা একদিন মোহিনীবাবুকে কী একটা ব্যাপারে অনুরোধ করলে তিনি সসম্মানে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু অনুরোধটা ঠিক অনুরোধ ছিলো না। মোহিনীবাবু এলাকা ছাড়লেন। এক বন্ধুর বাসায় ছিলেন কদিন। বেচারা বন্ধুর নাক বোঁচা করে দিয়ে ওখান থেকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেলো নেতার সাঙ্গোপাঙ্গরা। মধ্যিপথে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার ভান করে পালালেন মোহিনী বাবু। হপ্তাহ কয়েক এদিক সেদিক ঘুরে আবার বন্ধুর বাসায় গেলে বন্ধু তাঁকে দরজার হুড়কা দেখিয়ে দিলো। আপিসের সামনে ষণ্ডা দেখতে কয়েকটা ছেলে-পেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আপিসমুখোও হন না। চাকরিটা শেষ অব্দি খুইয়ে ফেলেছেন। জমানো টাকাও শেষ। আত্মীয় স্বজনের কাছে চেয়েমেয়েও খুব লাভ হয়নি। সবগুলো দুয়োর বন্ধ। এমনিতেই রোগা মানুষ ছিলেন, এখন হাড় গোণা যায়। ফ্যাসফেসে গলায় কথা বলেন।
এসবের কিছুই জানি না। মোহিনীবাবুর সাথে শেষ সাক্ষাতের কয়েক মাস পরের কথা। মনের সুখে শিস বাজাতে বাজাতে আসছিলাম। সেদিনও সন্ধ্যা। শহরের দিকে এক রুম নিয়েছি। দেখি দরজার সামনে জীর্ণ, মলিন, খর্বকায় এক লোক বসে আছে। খেয়াল করে দেখি মোহিনীবাবু। সঙ্গে সঙ্গে ফুড়ুৎ করে পকেট থেকে হাত বের করে বাড়িয়ে ধরলাম— মোহিনীবাবু, ক'টা টাকা দিন না।
কী মনে করে এ গল্প লিখেছিলাম ক'বছর আগে আমার খেয়াল নেই। তবে নিজের কাজ ঠিক ঠাক করিয়ে নিয়ে, অন্যের বেলায় পগারপার হওয়া লোক অনেক দেখেছি, এখনও দেখি। কৃতজ্ঞতাবোধহীন মানুষকে পছন্দ এখনও করি না।
মূল লেখা প্রকাশ করেছিলাম আমার ফেসবুক প্রোফাইলে।